মিথ্যার উপর নাসিবিদের উৎসব ও আল্লামা শাহ আহমদ শফীর ফতোয়া

সালাওয়াত আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলে মুহাম্মাদ ওয়া লা’আন আলা আদাইহিম।

সেই ট্র্যাডিশন, সেই পুরানো গান, সেই লম্ফ ঝম্প, মিথ্যা হাদিসের উপর তাসের ঘর বাঁধা। হা ঠিক ধরেছেন এটা নাসিবিদের কাজ। নাসিবিদের এটাই স্বভাব। হাজিদের গণহত্যা করার পর তাদের পিঠ ও পেট বাঁচাতে নাসিবিরা শিয়া বিরোধী প্রোপাগান্ডা চালিয়ে হাজিদের হত্যাকারিদেরকে আড়াল করতে চাইছে।

এক্ষেত্রে ও সেই পুরানো সুর, শিয়া কাফের সেই পুরানো গান শিয়া রাফেদি !!

এর প্রমান হিসাবে এক নাসেবি কপি-কাট দেওবন্দী সাইট থেকে একটা হাদিস তুলে দিয়েছে, যেটা নিচে দেওয়া হল। এই তথাকথিত হাদিসটি মুসনদে আহমাদ এ পাওয়া যায়।

حَدَّثَنَا عَبْدُ اللهِ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرٍالْوَرْكَانِيُّ، فِي سَنَةِ سَبْعٍ وَعِشْرِينَ وَمِائَتَيْنِ حَدَّثَنَا أَبُوعَقِيلٍ يَحْيَى بْنُ الْمُتَوَكِّلِ، وحَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ سُلَيْمَانَلُوَيْنٌ، فِي سَنَةِ أَرْبَعِينَ وَمِائَتَيْنِ حَدَّثَنَا أَبُو عَقِيلٍ يَحْيَىبْنُ الْمُتَوَكِّلِ، عَنْ كَثِيرٍ النَّوَّاءِ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ بْنِ حَسَنِ بْنِ حَسَنِبْنِ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِّهِ، قَالَ: قَالَعَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ، قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِوَسَلَّمَ: ” يَظْهَرُ فِي آخِرِ الزَّمَانِ قَوْمٌ يُسَمَّوْنَ الرَّافِضَةَيَرْفُضُونَ الْإِسْلامَ ” (1)

“শেষ যামানায় একটা দল উদ্ভব হবে যাদেরকে রাফেদি ডাকা হবে, তারা ইসলামকে ছেড়ে দেবে”।

–  কিছু তস্য নাসিবিদের এই মিথ্যা হাদিস নিয়ে উৎসব করতে দেখা গিয়েছে।

এখন দেখুন এই হাদিস হচ্ছে জাল। কারন আহলে সুন্নাহর মতেই রাফেদি প্রথম শতাব্দীতেই উদ্ভব হয়েছে। তার মানে প্রথম শতাব্দী কি আখেরি যামানা? হাদিস জাল কারীরা এতো অজ্ঞ যে ইসলামের প্রথম শতাব্দীকেই শেষ যামানা ধরে নিয়েছে।

উপরন্তু উপরের হাদিসকে নাসিরুদ্দিন আলবানী যইফ বলেছেন। আহমেদ শাকির তার মুসনাদে আহমাদের টিকায় যাইফ বলেছেন। (হাদিস নং ৮০৮)

সৌদি সালাফি মুহাদ্দিস শোয়াইব আরনাউত তার মুসনদে আহমাদের তাহকিক এ লিখেছেন চরম যইফ। তিনি আরও লিখেছেন ইবনে জাওযি তার ‘ইলাল’ এ এই হাদিস উল্লেখকরে বলেছেন যে এটা রসুল সাঃ থেকে সহিহ নয় । (হাদিস নং ৮০৮)

وبهذا وغيره يعرف كذب لفظ الأحاديث المرفوعةالتي فيها لفظ الرافضة

এমনকি ইবনে তাইমিয়া তার মিনহাজ আস সুন্নাতে লিখেছেন রাফেদি/রাফেযি এই শব্দ যে সব হাদিসের এসেছে সেগুলি মিথ্যা। সুতরাং নাসেবিদের লিডার ইবনে তাইমিয়াই এই সব রিজেক্ট করে দিয়েছে। আর তস্য নাসিবিরা নাচছে!

বাংলাদেশের মহান হুজুর শফি সাহেব তার সাহাবাদের প্রতি ঘৃনা প্রকাশ করে সাহাবিকে কাফের ফতোয়া দিলেন। সেই সাথে আহলে সুন্নার বহু বড় বড় মুহাদ্দেস, আলেম, ইমামগনদের কাফের ফতোয়া দিলেন।

এই ইসলাম বিদ্বেষী ওহাবি ও খারেজী হুজুর ২০১৫ এর মে মাসের প্রথম সপ্তাহে একটা সম্মেলন করে ফতোয়া দিলেন যে শিয়ারা কাফের যে মানে না তারাও কাফের। অথচ এটা ছিল হেফাজতে ইসলামের উপর দমন পীড়নের বার্ষিকী। সেই অর্থে অভিযানে বিরুদ্ধে তথা যারা মারা গিয়েছিল তাদের স্বরণ ইত্যাদির মাধ্যমে হওয়ার কথা। কিন্তু তিনি তা না করে শীয়াদের বিরুদ্ধে বিষদগার করলেন, যেটা অপ্রাসাঙ্গগিক। আসলে চিন্তার দৈনতা দেখা দিলে এইরূপ হয়। যাইহোক নিচে এই বিষয় আলোচনা করা হোক।

এই ফতোয়ার অধীনে কারা কারা কাফের হয়ে যায় তার তালিকায় এসে যায় সাহাবী, তাবেঈ। হাদিসের ইমামগনের মধ্যে ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম, ইমাম নাসায়ী সহ অগণিত মুহাদ্দিস। আর মাযহাবের ইমামের মধ্যে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল, ইমাম শাফেইও।

এখন দেখুন সাহাবী আবু তুফাইল একজন শিয়া রাফেদি ছিলেন। যার থেকে হাদিস প্রায় সব মুহাদ্দেসই বর্ণনা করেছেন।

সাহাবী আবু তুফাইল আমর বিন ওসিলা (রাঃ) যিনি একজন শিয়া রাফেযি ছিলেন।

ইমাম বুখারি তার বই ‘তারিখ আস সাগীর’ এ লিখেছেনঃ (খণ্ড ১ পাতা ২৮৫)

قال أبو الطفيل أدركت ثمان سنين من حياة النبي صلى اللهعليه وسلم

“আবু তুফাইল বলেছেন ‘আমি রাসুলের জীবনের ৮ বছর পেয়েছি”।

ইবনে আসাকির তার ‘তারিখ মদিনাতুদ দামিস্ক’ এর খণ্ড ২৬ পাতা ১৪৪ এ উল্লেখ করেছেন

“রাসুল (সাঃ) এর শেষ যে সাহাবী দুনিয়ার বুকে মারা গিয়েছিলেন তিনি আমর আবু তুফাইল ইবন ওসিলা”

ইবনে হিব্বান তার “শিকাত (বিসস্ত)” বইয়ের খন্ড তিন পাতা ২৯১ এ লিখেছেনঃ

عامر بن واثلة أبو الطفيل المكى أدرك ثمان سنين من حياة رسول اللهصلى الله عليه وسلم ومات بمكة سنة سبع ومائة وهو آخر من مات من أصحاب رسول اللهصلى الله عليه وسلم بمكة وهو من بنى كنانة

“আমর বিন ওয়াসিলা আবু তুফাইল আল মাক্কি রাসুলের (সাঃ) জীবনের আট বছর পেয়েছিলেন, ১০৭ হিজরিতে মক্কাতে মারা যান, তিনি রাসুলের সাঃ শেষ সাহাবা মক্কাতে মারা গিয়েছিলেন”।

যাহাবি তার ‘আল কাশিফ’ এর খন্ড ১ পাতা ৫২৭ এ উল্লেখ করেছেনঃ

وبه ختم الصحابة في الدنيا مات سنة عشرومائة على الصحيح

“তিনি খাতামুস (শেষ) সাহাবী ছিলেন………।”

হাফেজ ইবনে হাজর আস্কালানি তার ‘তাকরিব আত তাহজিয’ এ ইবনে কাসির তার ‘আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া’তে আবু তুফাইলকে সাহাবী বলে উল্লেখ করেছেন।

এখন দেখা যাক এই মহান সাহাবী কি বিশ্বাস করতেন ও কি ছিলেনঃ

ইবনে হাযম তার ‘আল মুহালা’র খণ্ড ৩ পাতা ১২৭ এ উল্লেখ করেছেন

أن أبا الطفيل صاحب راية المختار وذكرأنه كان يقول بالرجعة

“আবু তুফাইল মুখতারের বাহিনীর পতাকাবাহী ছিলেন, বলা হয় যে তিনি ‘রাজ’আ এ বিশ্বাস করতেন”। (নোটঃ রাজ’আ শিয়াদের একটা বিশেষ বিশ্বাস।)

ইমাম যাহাবি তার ‘সিয়ার আলাম আন নুবালা’র খণ্ড ৩ পাতা ৪৬৮ তে

واسم أبي الطفيل عامر بن واثلة بن عبد الله بن عمرو الليثي الكنانيالحجازي الشيعي. كان من شيعة الإمام علي.

“আবু তুফাইল এর নাম হল আমর বিন ওয়াসিলা বিন আব্দুল্লাহ বিন আমরু ইসলি কিনানি হেজাজি, যিনি শিয়া ছিলেন। ইমাম আলী এর শিয়া ছিলেন”।

ইবনে কুতাইবা তার ‘কিতাব আল মারিফ’ এর পাতা ১৪৯ তে লিখেছেন। ( মিশরের ছাপা )

أبو الطفيل عامر بن واثلة رأى النبي صلى الله عليه وسلم وكانآخر من رآه موتا ومات بعد سنة مائة وشهد مع علي المشاهد كلها وكان مع المختار صاحبرايته وكان يؤمن بالرجعة

“আবু তুফাইল আমর বিন ওয়াসিলা রাসুল সাঃ কে দেখেছিলেন। তিনি শেষ ব্যাক্তি মারা গিয়েছিলেন যারা রাসুল সাঃ কে দেখেছিলেন, …………… তিনি আলি এর সাথে সবযুদ্ধে অংশ গ্রহন করেছিলেন, মুখতারের (রহঃ) বাহিনীর পতাকাবাহী ছিলেন, আর রাজ’আ এ বিশ্বাস করতেন”।

ইবনে কুতাইবা তার একই গ্রন্থে ৩৪০ পাতায় কিছু ‘গালি’ (উগ্র/অর্থডক্স/এক্সট্রিমিস্ট) রাফেজি শিয়াদের নাম উল্লেখ করেছেন যার হেডিং দিয়েছেন-

أسماء الغالية من الرافضة

“উগ্রশিয়াদের নাম” এই হেডিং এর অন্তর্গত যে সব নাম দিয়েছেনঃ

أبو الطفيل صاحب راية المختار، وكان آخر من رأى رسول الله صلى الله عليه وسلم موتاً. والمختار ، وأبو عبد الله الجدلي ، وزرارة بن أعين ، وجابر الجعفي.

১। আবু তুফাইল, মুখতার এর পতাকাবাহী। (তিনি শেষ ব্যাক্তি ছিলেন যিনি আল্লাহের রসুল সাঃ কে দেখেছেন)
২। মুখতার
৩। আবু আব্দুল্লাহ আল জাদালি
৪। যুরারাহ ইবনে আওন
৫। জাবির জুফি।

দেখুন ইবনে কুতাইবা কিভাবে এই সাহাবিকে যুরারাহ, জাবির বিন জুফি এর মত শিয়াদের গ্রুপে রেখেছেন। এত বোঝা যাচ্ছে যে আবু তুফাইল রাঃ এর কত বড় রাফেদি ছিলেন। আল্লাহ এই সব রাফেদিদের প্রতি রহম করুক।

এই রাফেদি শিয়া সাহাবির থেকে প্রায় সমস্ত হাদিসের লেখকগণ হাদিস নিয়েছেন, ইমাম মুসলিম, নাসাই আবু দাউদ আরও অসংখ্য হাদিসবিদ। তারা কেউ এই সাহাবিকে শিয়া রাফেদি হওয়ার কারনে কাফের মনে করত না।

সুতরাং শফী হুজুরের ফতোয়া অনুযায়ী এই সাহাবী সহ ঐ সব মুহাদ্দিসগন সবাই কাফের ছিলেন!

আল্লামা শফী এর ফতোয়া অনুযায়ী ইমাম বুখারি সহ হাদিসের ইমাম গণ ভয়ংকর কাফের ছিলেন!

ইমাম বুখারি ও অন্যান্য হাদিসের ইমামগন তাদের সাহিহ তে প্রচুর শিয়া রাফেদিদের থেকে হাদিস নিয়েছেন। সুতরাং শিয়া কাফেরদের থেকে হাদিস নেওয়ার কারনে এবং শিয়াদের কাফের না মনে করার করনে ইমাম বুখারি কাফের ছিলেন।

নিচে মাত্র কয়েক জন শিয়া রাফেদি এর নাম দেওয়া হল যাদের থেকে হাদিস গ্রহণ করেছেন আহলে সুন্নার বড় বড় মুহাদ্দিস গণঃ

১। আবান ইবনে তাগলিব ইবনে রিবাহ (কুফী ক্বারী)

যাহাবী তাঁর ‘মিযানুল ই’তিদাল’ গ্রন্থে তাঁর নাম উল্লেখ করে বলেছেন, “আবান ইবনে তাগলিব কুফার অধিবাসী, প্রতিষ্ঠিত শিয়া কিন্তু সত্যবাদী, তাঁর সত্যবাদিতার কারণে তাঁর হাদীস আমাদের নিকট গ্রহণযোগ্য। কিন্তু তাঁর বিচ্যুত ধারণা তাঁর দায়িত্বেই।” আরো বলেছেন, “আহমাদ ইবনে হাম্বল, ইবনে মুঈন, আবু হাতেম তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন।” ইবনে আদী তাঁর নাম উল্লেখ করে বলেছেন, “শিয়া বিশ্বাসে সে অটল ছিল।” যাহাবী তাঁকে সেসব ব্যক্তিবর্গের অন্তর্ভুক্ত বলেছেন যাঁদের থেকে মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ্ হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর নামের পার্শ্বে তাঁর হাদীস গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন। হাকাম, আ’মাশ ও ফুযাইল ইবনে আমর হতে আবান যে সকল হাদীস বর্ণনা করেছেন তা সহীহ মুসলিম ও সুনানে আরবাআহ’তে রয়েছে।

২। ইবরাহীম ইবনে ইয়াযীদ ইবনে আমর ইবনে আসওয়াদ ইবনে আমর নাখয়ী

সিহাহ সিত্তাহ্সহ অন্যান্য হাদীস গ্রন্থের লেখকগণ তাঁদের বর্ণিত হাদীস রেওয়ায়েত করে তাঁর থেকে বিভিন্ন বিষয় প্রমাণ করেছেন যদিও তাঁরা জানতেন এরা সকলেই শিয়া মতাবলম্বী।

ইবনে কুতাইবা তাঁর ‘মা’আরিফ’ গ্রন্থের ২০৬ পৃষ্ঠায় ইবরাহীম ইবনে ইয়াযীদকে শিয়া (হাদীস বর্ণনাকারী) বলে উল্লেখ করে নিম্নোক্ত বিষয়কে অকাট্য বলেছেন-

তিনি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে তাঁর মায়ের চাচা আলকামা ইবনে কাইস, হাম্মাম ইবনে হারিস, আবু উবাইদা ইবনে আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ, আবু উবাইদা ও তাঁর মামা আসওয়াদ ইবনে ইয়াযীদ হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন। এজন্য আপনি সহীহ মুসলিমে তিনি তাঁর মামা আবদুর রহমান ইবনে ইয়াযীদ, সাহম ইবনে মিনজাব, আবু মুয়াম্মার,উবাইদ ইবনে নাজলা ও আব্বাস হতে যে সকল হাদীস বর্ণনা করেছেন সেগুলো দেখতে পারেন।

তেমনি সহীহ বুখারী ও মুসলিমে মনসুর, আ’মাশ, জুবাইদ, হাকাম ও ইবনে আউন তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

৩। আহমাদ ইবনে মুফাদ্দাল ইবনে কুফী বাদরী

আবু জারআ এবং আবু হাকীম তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর হাদীসকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁরা দু’জনই আহমাদের শিয়া হবার ব্যাপারে নিঃসন্দেহ ছিলেন। ‘মিযানুল ই’তিদাল’ গ্রন্থে আহমাদ সম্পর্কে আবু হাতেম বলেছেন, “আহমাদ ইবনে মুফাদ্দাল শিয়া হাদীস বর্ণনাকারীদের মধ্যে প্রথম সারির এবং একজন সত্যবাদী ব্যক্তি।”

যাহাবী তাঁর ‘মিযানুল ই’তিদাল’ গ্রন্থে তাঁর নাম এনেছেন এবং সাংকেতিকভাবে তৎপার্শ্বে আবু দাউদ ও নাসায়ী লিখেছেন যার অর্থ আবু দাউদ ও নাসায়ী তাঁকে নির্ভরযোগ্য মনে করেছেন।

৪। ইসমাঈল ইবনে আবান (আজদী কুফী)

তিনি বুখারীর শিক্ষক ছিলেন। যাহাবী তাঁর ‘মিযানুল ই’তিদাল’ গ্রন্থে তাঁর নাম এনেছেন এবং তাঁর বিষয়ে বলেছেন, “বুখারী ও তিরমিযী তাঁদের সহীহতে তাঁকে নির্ভরযোগ্য মনে করেছেন ও তাঁর হাদীস থেকে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন।” তিনি আরো বলেন, “ইয়াহিয়া ও আহমাদ তাঁর থেকে হাদীস শিক্ষা করেছেন এবং বুখারী তাঁকে সত্যবাদী বলেছেন।” অন্যরাও তাঁকে শিয়া মতাবলম্বী বলে জানতেন।

বুখারী সরাসরি তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন যেমনটি কাইসারনী বলেছেন ও অন্যরা তা সত্যায়ন করেছেন।

৫। ইসমাঈল ইবনে খালীফা মাল্লাঈ কুফী (আবু ইসরাঈল বলে প্রসিদ্ধ)

যাহাবী তাঁর ‘মিযানুল ই’তিদাল’ গ্রন্থে الكنى (কুনিয়াসমূহ) অধ্যায়ে তাঁর পরিচিতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, “সে একজন কট্টর শিয়া এবং সেই অংশের অন্তর্ভুক্ত যারা উসমানকে কাফির মনে করতো”, তাঁর সম্পর্কে অনেক বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে যা এখানে বর্ণনা করা অপ্রয়োজনীয় মনে করছি। এতদ্সত্ত্বেও তিরমিযী ও সুনান বর্ণনাকারী অনেকেই তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। আবু হাতেম তাঁর হাদীসকে উত্তম বলেছেন এবং প্রশংসা করেছেন। আবু জারআ বলেছেন, “সে সত্যবাদী, বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আলীর বিষয়ে বাড়াবাড়ি রকমের বিশ্বাস পোষণকারী। আহমাদ বলেছেন, “তাঁর বর্ণিত হাদীস সংরক্ষণ করা উচিত।” ইবনে মুঈন তাঁর সম্পর্কে একস্থানে বলেছেন, “তিনি সিকাহ ও বিশ্বাসযোগ্য।” তাঁর বিষয়ে ফালাস মনে করেন তিনি মিথ্যাবাদী নন। সহীহ তিরমিযী ও অন্যরা হাকাম ইবনে উতাইবা এবং আতিয়া আউফী হতে তাঁর সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তদুপরি ইসমাঈল ইবনে উমার বাজালী তাঁর সমপর্যায়ের অনেক হাদীস বর্ণনাকারী তাঁর হাদীস নকল করেছেন।

ইবনে কুতাইবা তাঁর ‘আল মা’আরিফ’ গ্রন্থে তাঁকে শিয়া রাবী ও হাদীস বর্ণনাকারী বলে উল্লেখ করেছেন।

৬। ইসমাঈল ইবনে যাকারিয়া আসাদী (খালকানী,কুফী)

যাহাবী তাঁর ‘মিযানুল ই’তিদাল’ গ্রন্থে তাঁর অবস্থা বর্ণনা করে বলেছেন, “ইসমাঈল ইবনে যাকারিয়া খালকানী কুফী একজন শিয়া ও সত্যবাদী। সিহাহ সিত্তাহর হাদীস লেখকগণ যাঁদের থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন তিনি তাঁদের অন্যতম। তাঁর নামের পাশে তিনি যে সাংকেতিক চি‎‎হ্ন ব্যবহার করেছেন তার অর্থ হলো সিহাহ সিত্তাহর লেখকগণ তাঁকে নির্ভরযোগ্য রাবী মনে করেন। সহীহ বুখারীর বর্ণনামতে তিনি মুহাম্মদ ইবনে সাওকা, উবায়দুল্লাহ্ ইবনে উমর হতে এবং সহীহ মুসলিমে তিনি সুহাইল, মালিক ইবনে মুগুল ও অন্যান্যদের হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন। সহীহাইন তাঁর সূত্রে আছেম হতে কয়েকটি হাদীস নকল করেছেন।

মুহাম্মদ ইবনে সাবাহ্ ও আবু রাবিই হতে তাঁর সূত্রে সহীহাইন (সহীহ বুখারী ও মুসলিম) এবং মুসলিম, মুহাম্মদ ইবনে বাক্কার হতে তাঁর সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি ১৭৪ হিজরীতে বাগদাদে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর শিয়া হবার বিষয়টি সর্বজনবিদিত। তাঁর সম্পর্কে এমনও বলা হয়েছে যে, তিনি বিশ্বাস করতেন, হযরত মূসা (আ.)-কে যিনি তুর পর্বতে আহবান করেছিলেন তিনি আলী ইবনে আবি তালিব ছিলেন এবং প্রথমও আলী, শেষও আলী, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যও আলী।

৭। ইসমাঈল ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আবি কারিমা কুফী (মুফাসসির,যিনি সিদ্দী নামে পরিচিতি ও প্রসিদ্ধ)

যাহাবী তাঁর ‘মিযানুল ই’তিদাল’ গ্রন্থে তাঁকে শিয়া বলে উল্লেখ করেছেন। অতঃপর হুসাইন ইবনে ওয়াকেদ মারওয়াজী হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি সিদ্দীকে হযরত আবু বকর ও উমরের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুনেছেন। এতদ্সত্ত্বেও সুফিয়ান সাওরী, আবু বকর ইবনে আয়াশ ও তাঁদের সমপর্যায়ের অন্যান্য রাবীরা তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। মুসলিম ও সুনানে আরবাআহর লেখকগণ তাঁর হাদীস হতে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন এবং তাঁর হাদীসকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন। আহমাদ ইবনে হাম্বল তাঁকে সত্যবাদী বলেছেন। ইবনে আদী বলেছেন, “তিনি সত্যবাদী ও নির্ভরযোগ্য।” ইয়াহিয়া কাত্তান বলেছেন, “তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনায় কোন অসুবিধা নেই।” ইয়াহিয়া ইবনে সায়ীদ বলেছেন, “আমি সিদ্দী সম্পর্কে কারো নিকট ভাল বৈ মন্দ শুনিনি। সকলেই তাঁর হাদীস নকল করেছেন।”

ইব্রাহীম নাখায়ী সিদ্দীর পাশ দিয়ে যাবার সময় তাঁকে কোরআন তাফসীর করতে দেখে বললেন, “তাফসীরকারকদের পন্থায় সে তাফসীর করছে” অর্থাৎ শিয়া মাজহাব অনুযায়ী তাফসীর করছে। এ বিষয়ে ‘মিযানুল ই’তিদাল’ গ্রন্থে তাঁর অবস্থা বর্ণনা করে যাহাবী যা বলেছেন তা অধ্যয়ন করুন।

সহীহ মুসলিমে তিনি আনাস ইবনে মালিক, সা’দ বিন উবাদা ও ইয়াহিয়া ইবনে আব্বাদ হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন। মুসলিম ও সুনানে আরবাআহতে আবু ইবাদ, সুফিয়ান সাওরী, হাসান ইবনে সালিহ, জায়িদা এবং ইসরাঈল তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। সুতরাং তিনি এ সকল ব্যক্তিত্বের শিক্ষক ছিলেন। ১২৭ হিজরীতে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।

উপরে মাত্র ৭ জনের নাম দেওয়া হল। এক্ষেত্রে তালিকা বানালে ১০০ জনের ও বেশী হয়ে যাবে।

আল্লামা শফীর ফতোয়া অনুযায়ী রাসূলে পাক (সাঃ) কাফের! এই ফতোয়া শুধুমাত্র শিয়াদের বিরুদ্ধে নয় বরং রাসূলে পাক (সাঃ) বিরুদ্ধে হয়ে গিয়েছে।

আল্লামা শফীর ফতোয়া দিলেন যে শিয়া কাফের যে না মানবে সেও কাফের।

রাসুল (সাঃ) শিয়া সম্বন্ধে কি বলেছেনঃ সূরা বাইয়েনা আয়াত নং ৭

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَئِكَ هُمْ خَيْرُ الْبَرِيَّةِ 

“যারা ইমান এনেছে ও আমলে সালেহ করেছে তারাই হচ্ছে সর্বত্তম সৃষ্টি” এই ‘খারুল বারিয়া’ বা সর্বত্তম সৃষ্টি কারা? দেখুন রাসূলে পাক (সাঃ) কি বলছেন।

( أُولَئِكَ هُمْ خَيْرُ الْبَرِيَّةِ ) فقال النبي صلى الله عليه وسلم: “أنْتَ يا عَلي وَشِيعَتُكَ”.

“(তারাই সর্বত্তম সৃষ্টি) রাসুল (সাঃ) বলেছেন ‘হে আলী তুমি ও তোমার শিয়ারা”। (তাফসীরে তাবারী সূরা বাইয়েনার ৭ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় )

সুতরাং রাসুল (সাঃ) এর মতে আলী ও তার শিয়ারা সর্বত্তম সৃষ্টি, অর্থাৎ রাসুল (সাঃ) শিয়াদের কাফের বলতেন না বরং উল্টো বলতেন। আর শফী হুজুরের ফতোয়া মতে রাসুল (সাঃ) কাফের বলে পরিগণিত হল!

তফসীরে দুররুল মানসুর, আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়তি এই আয়াত প্রসঙ্গে হাদিস উল্লেখ করেছেনঃ

وأخرج ابن عساكر عن جابر بن عبد الله قال: «كنا عند النبي صلى الله عليه وسلم فأقبل عليّ فقال النبي صلى الله عليه وسلم : » والذي نفسي بيده إن هذا وشيعته لهم الفائزون يوم القيامة، ونزلت {إن الذين آمنوا وعملوا الصالحات أولئك هم خير البرية}

“জাবির বিন আব্দুল্লাহ রাঃ বর্ণনা করেছেন ‘আমরা নবী (সাঃ) এর কাছে ছিলাম তখন আলী প্রবেশ করল, নবী (সাঃ) বললেন ‘যার হাতে আমার নাফস নিশ্চই এই ব্যাক্তি ও তার শিয়ারা কিয়ামতের দিন কামিয়াব হবে’, আর এই আয়াত নাজিল হল “যারা ইমান এনেছে ও আমলে সালেহ করেছে তারাই হচ্ছে সর্বত্তম সৃষ্টি”

তফসীরে দুররুল মানসুর আরও উল্লেখ করেছেনঃ

وأخرج ابن عدي عن ابن عباس قال : « لما نزلت { إن الذين آمنوا وعملوا الصالحات أولئك هم خير البرية } قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لعلي : » هو أنت وشيعتك يوم القيامة راضين مرضيين

“ইবনে আব্বাস বলেছেন ‘যখন এই আয়াত নাজিল হয় ‘যারা ইমান এনেছে ও আমলে সালেহ করেছে তারাই হচ্ছে সর্বত্তম সৃষ্টি’ আলিকে রাসূল (সাঃ) বলেন ‘এরা তুমি ও তোমার শিয়ারা যারা কেয়ামতের রাযী ও মরযিন হবে’”।

তাফসীরে দুররুল মানসুর আরও হাদিস উল্লেখ করা হয়েছেঃ

وأخرج ابن مردويه عن عليّ قال : قال لي رسول الله صلى الله عليه وسلم : « ألم تسمع قول الله : { إن الذين آمنوا وعملوا الصالحات أولئك هم خير البرية } أنت وشيعتك وموعدي وموعدكم الحوض إذا جئت الأمم للحساب تدعون غرّاً محجلين »

সুতরাং রাসূল (সাঃ) কথা অনুযায়ী শিয়ারা কেয়ামতের দিন সফল ও আল্লাহ কতৃক রাযী অবস্থায় উঠবে। হাদিসে আরও বলছে শিয়ারা কেয়ামতের দিন কামিয়াব হবে খুশি অবস্থায় থাকবে।

অথচ শফী হুজুরের মতে শিয়ারা কাফের যারা না মানবে তারাও কাফের! সুতরাং শফী হুজুর পক্ষান্তরে রাসুল (সাঃ) কেই কাফের বানালেন!

আল্লাহ তার শত্রুদের মুনাফেকি এই ভাবে প্রকাশ করে দেন। শফী হুজুরের ক্ষেত্রেও তাই হল। আল্লাহর অশেষ শোকর যে আহলে বাইতের অনুসারিদের শত্রুদের মুখে সর্বদাই কালিমা লিপ্ত করেছেন।

আল্লাহুম্মা সাল্লে আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলে মুহাম্মাদ ওয়া লা’আন আলা আদাইহিম।