ইয়াজিদ লা’নাতুল্লাহ আলাইহির চরিত্র, কর্মকান্ড ও আহলে সুন্নাহর বিভিন্ন আলেমদের মতামত

বর্তমানে এটি পরিলক্ষিত হচ্ছে যে, কিছু মানুষ আহলে-বায়েত (আঃ) এর প্রতি নিজেদের প্রত্যক্ষ, এমন কি পরোক্ষ ঘৃণার বহিঃপ্রকাশস্বরূপ ইয়াজিদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড ধামাচাপা দিতে সচেষ্ট এবং এরই ধারাবাহিকতায় তারা তাকে এক মহান ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিত্রিত করছে। আল্লাহর অনুগ্রহে আমরা এই লেখায় ইসলামের এই বিশ্বাসঘাতক (ইয়াজিদ) কিভাবে ইমাম হুসাইন আলাইহি সালামকে শহীদ করেছিল এবং কীভাবে সে মদীনা মোনাওয়ারাকে লণ্ডভণ্ড করে লুঠতরাজ চালিয়েছিল সে সম্পর্কে আলোকপাত করবো।

(সকল দলিল/প্রমাণ আহলে সুন্নাহর কিতাব হতে প্রাপ্ত।)

প্রথমত আমরা মহানবী (সাঃ)-এর একটি সহীহ হাদীস উল্লেখ করবো, যা মনোরম মদীনা মোনাওয়ারা নগরীকে যে সব লোক ’লণ্ডভণ্ড’ করে তাদের সম্পর্কে বর্ণনাঃ

ইমাম আহমদ (রহঃ) হযরত সা’য়েব ইবনে খালেদ (রাঃ) এর সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হাদীস, যিনি এরশাদ করেনঃ

“যে কেউ অন্যায়ের প্রসার এবং মদীনাবাসীদের হয়রানি বা ভীত-সন্ত্রস্ত করে, তার প্রতি আল্লাহর লা’নত (অভিসম্পাত), ফেরেশতাকুলের এবং গোটা মানবজাতির (মো’মেন বান্দাদের) লা’নত।”

  • আহমদ : আল মুসনাদ, মুসনাদ আলী ইবনে আবী তালিব, ১:৮১, হাদীস নং ৬১৫।
  • বুখারী : আস সহীহ, বাবু হারামিল মদীনা, ৩:২০ হাদীস নং ১৮৬৭।
  • মুসলিম : আস সহীহ, বাবু ফদ্বলিল মদীনা, ২:৯৯৪ হাদীস নং ১৩৬৬।
  • আবূ দাঊদ : আস সুনান, বাবু ফি তাহরিমিল মদীনা, ২:২১৬ হাদীস নং ২০৩৪।
  • তিরমিযী : আস সুনান, ৪:৪৩৮ হাদীস নং ২১২৭।
  • নাসায়ী : আস সুনানুল কুবরা, ৪:২৫৮ হাদীস নং ৪২৬৩।
  • ইবনে কাসীর : আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮:২৭৪।

কুরআন মজীদে ঘোষিত হয়েছে:

“নিশ্চয় যারা কষ্ট দেয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) কে, তাদের প্রতি আল্লাহর লা’নত (অভিসম্পাত) দুনিয়া ও আখেরাতে এবং আল্লাহ তাদের জন্যে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন।” আল কুরআন: সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৫৭।

মহানবী (সাঃ)-এর কাছে তাঁর দৌহিত্রকে নৃশংসভাবে শহীদ করা এবং তিনি যে স্থানকে পবিত্র বলে ঘোষণা করেছেন সেই স্থানকে তছনছ করার চেয়ে বেশি কষ্টদায়ক আর কী-ই বা হতে পারে?

১/ ইয়াজিদের নানা ঘৃণ্য অপরাধ

ইবনে কাসীর ৬৩ হিজরীর (কারবালার) ঘটনা সম্পর্কে নিজ ‘তারিখ’ গ্রন্থে লিখেন:

ইবনে যুবাইর (রাঃ) বলেন, ওহে মানুষেরা! তোমাদের আসহাবদেরকে হত্যা করা হয়েছে – ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন। – ইয়াজিদ একটি ঘৃণিত কাজ করেছে মদীনা মোনাওয়ারাকে তিন দিনের জন্যে ‘মোবাহ’ হিসেবে কার্যকর করার লক্ষ্যে মুসলিম ইবনে উকবাকে আদেশ দিয়ে। এটি ছিল তার সবচেয়ে বড় ও মারাত্মক ভুল। অনেক সাহাবা-এ-কেরাম ও তাঁদের সন্তানদের হত্যা করা হয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের মাধ্যমে ইয়াজিদ আমাদের রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইনকে ও তাঁর সাথীদের শহীদ করে; আর ওই তিন দিনে মদীনা মোনাওয়ারায় এমন সব গর্হিত অপরাধ সংঘটিত হয় যা আল্লাহ ছাড়া কেউই জানেন না। ইয়াজিদ তার শাসনকে মুসলিম ইবনে উকবাহর প্রেরণের মাধ্যমে সংহত করতে চেয়েছিল, কিন্তু আল্লাহতা’লা তার ইচ্ছাকে পুরো হতে দেননি এবং তাকে শাস্তি দিয়েছিলেন। বস্তুতঃ আল্লাহ তাকে মেরে ফেলেন যেমনিভাবে তিনি আগ্রাসী শহরগুলোকে (অর্থাৎ, ওই শহরগুলোর আক্রমণকারীদেরকে) নিজ কবজায় নিয়েছিলেন;আর নিঃসন্দেহে আল্লাহর কবজা কঠোর ও বেদনাদায়ক।”

সূত্রঃ ইবনে কাসীর: আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮:২৮৩।

২/ ইবনে যিয়াদও ইয়াজিদের আচরণে বিরূপ

ইয়াজিদের অপরাধ এতো গর্হিত ছিল যে এমন কি তার অনুগত উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ যাকে মুসলিম ইবনে আকীল ও পরবর্তী পর্যায়ে ইমাম হুসাইনের হত্যার জন্যে পাঠানো হয়েছিল, এবং যাকে পত্র মারফত ইয়াজিদ বলেছিল মক্কায় গিয়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রাঃ) এর ওপর অবরোধ দিতে, সেও তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছিলঃ ‘আল্লাহর শপথ! আমি কোনো ফাসেক (পাপী ইয়াজিদ)- এর খাতিরে দুটো অপকর্মতে জড়াবো না। আমি ইতোমধ্যেই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মেয়ের (ঘরের) নাতিকে হত্যা করেছি; আর এখন (সে নির্দেশ দিচ্ছে) বায়তুল হারামের সাথে যুদ্ধ করতে।’ তবে ইয়াজিদ যখন ইমাম হুসাইনকে শহীদ করে, তখন তার মা মারজানা তাকে বলেন, ‘তুমি মরো গে! তুমি এই জঘন্য অপরাধ কীভাবে করতে পারলে?’ তিনি তাকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা করেন। ইয়াজিদকে জানানো হয় যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর তাঁর বিভিন্ন ভাষণে ইয়াজিদ সম্পর্কে বলতেন, সে একজন জালিয়াত, মদ্যপ, নামায তরককারী ও গায়িকা (ভ্রষ্টা) নারীদের সাহচর্যে অবস্থানকারী ব্যক্তি।

সূত্রঃ ইবনে কাসীর:আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮:২৭৯।

ইবনে কাসীর আরও  বর্ণনা করেন:

মুসলিম ইবনে উকবা, যার অপর পরিচিতি আস-সাইফ মুসরাফ বিন উকবা নামে (আল্লাহ এই বদ ও মূর্খ লোকের কল্যাণ না করুন, আমীন), সে ইয়াজিদের আদেশে মদীনা মোনাওয়ারার আক্রমণকে ‘বৈধতা’ দিয়েছিল তিন দিনের জন্যে। আল্লাহতা’লা ইয়াজিদকে ‘জাযা’ ও ’খায়র’ মঞ্জুর না করুন, আমীন। সে বহু ন্যায়বান মানুষের হত্যা সংঘটন করে এবং মদীনার বিপুল মালামাল লুঠপাট করে। একাধিক বর্ণনায় এসেছে যে সে ওখানে প্রচুর ক্ষতি সাধন করে এবং অনেক ফাসাদের জন্ম দেয়। এও উল্লেখিত হয়েছে যে সাহাবী হযরত মুয়াফল ইবনে সানানকে ইবনে উকবার সামনে বেঁধে রাখা হয় এবং তারপর শহীদ করা হয়। এই সময় সে বলে, ‘তুমি ইয়াজিদের বন্ধু ছিলে, কিন্তু পরে তুমি তার বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছ; তাই ইয়াজিদ তোমার প্রতি বিরূপ ভাবাপন্ন হয়েছে।

সূত্রঃ ইবনে কাসীর:আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮:২৮০।

৩/ নেতৃস্থানীয় তাবেঈ সাঈদ ইবনে মুসাইয়েব (রহঃ) এর প্রতি ইয়াজিদের বৈরিতা

আল-মুদাইনী (রহঃ) বলেন যে, হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়েব (রহঃ) কে নিয়ে আসা হয় মুসলিম বিন উকবার সামনে। সে তাঁকে তার কাছে বায়াত (আনুগত্য) গ্রহণ করতে বলে। তিনি এর জবাবে বলেন, “আমি শুধু হযরত আবু বকর ও হযরত উমরের সীরাতের (আদর্শের) প্রতি বায়াত নিতে পারি।” এমতাবস্থায় ইবনে উকবা তাঁকে হত্যার নির্দেশ দেয়। কিন্তু কেউ একজন (তাঁকে বাঁচাবার জন্যে) বলেন যে এই ব্যক্তি (হযরত সাঈদ) পাগল। এতে তাঁকে ছেড়ে দেয়া হয়।

সূত্রঃ ইবনে কাসীর: আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮:২৮১।

৪/  শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী (রহঃ)

ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী (রহঃ) তাঁর রচিত ‘আল-ইমতা’ বিল আরবাঈন’ শীর্ষক বইয়ের পুরো শিরোনামই দিয়েছেন ‘ইয়াজিদের প্রতি লা’নত’।এতে তিনি লিখেন,

“ইয়াজিদকে ভক্তি ও তার প্রশংসা ‘বেদআতী-গোমরাহ’ ব্যক্তি ছাড়া আর কেউই করে না, যে ব্যক্তির বিশ্বাস একেবারেই শূন্য। কেননা, ইয়াজিদের এমন সব বৈশিষ্ট্য ছিল যার ভক্ত-অনুরক্ত হলে কুফর তথা অবিশ্বাসের যোগ্য হতে হয়। এটা এই কারণে যে আল্লাহর ওয়াস্তে ভালোবাসা এবং তাঁরই ওয়াস্তে ঘৃণা করা ঈমানেরই লক্ষণ।”

সূত্রঃ ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী: আল-ইমতা বিল আরবাঈন আল-মাতবাইনাত আস সামা,দার আল-কুতুব আল-এলমিয়্যা, বৈরুত, লেবানন হতে ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত প্রণীত পুস্তকের ৯৬ পৃষ্ঠা।

ইমাম সাহেব (রহঃ) অন্যত্র লিখেন,

“ইয়াহইয়া ইবনে আব্দিল মুলক বিন আবি গানিয়্যা যিনি ’সিকা (নির্ভরযোগ্য) বর্ণনাকারীদের একজন’, তিনি ‘সিকা’ বর্ণনাকারী নওফল বিন আবি আকরাব থেকে শুনেছেন: একবার খলীফা উমর ইবনে আবদিল আযীয (২য় উমর)-এর দরবারে মানুষেরা ইয়াজিদ ইবনে মু’আবিয়া সম্পর্কে আলাপ করছিলেন। ওই সময় এক লোক ইয়াজিদকে ‘আমীরুল মো’মেনীন’ (ঈমানদারদের শাসক) খেতাবে সম্বোধন করে। এটি শুনে খলীফা ২য় উমর (রাগান্বিত হয়ে) তাকে বলেন, “তুমি ইয়াজিদকে আমীরুল মো’মেনীন ডেকেছ?” অতঃপর তিনি ওই লোককে ২০টি দোররা মারার হুকুম দেন।

সূত্রঃ ইমাম আসকালানী:তাহযিবুত্ তাহযিব,৬:৩১৩।

৫/ ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ুতী (রহঃ) তারিখুল খুলাফা গ্রন্থে বলেন

‘‘আপনি (ইমাম হুসাইন) শাহাদাত বরণ করেন এবং আপনার কর্তিত শির ইবনে যিয়াদের সামনে একটি থালায় করে আনা হয়। আপনাকে যে ব্যক্তি হত্যা করেছে তার ওপর আল্লাহর লা’নত (অভিসম্পাত); আরও লা’নত ইবনে যিয়াদ ও ইয়াজিদের ওপর।”

সূত্রঃ ইমাম সৈয়ুতী রচিত: তারিখুল খুলাফা, ১:১৬৫। 

ইমাম সৈয়ুতী (রহঃ) আরও লিখেন:

নগরী লুঠপাটের পরে সে তার বাহিনীকে পবিত্র মক্কায় পাঠায় সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রাঃ) কে শহীদ করার জন্যে। ওই সময় ‘হাররা’-এর ঘটনা ঘটে। হাররায় কী ঘটেছিল আপনারা জানেন কি? এ প্রসঙ্গে (তাবেঈ) হযরত হাসান বলেন, হযরত নওফল বিন আবি ফিরায়াত (রহঃ) বলেছেন যে, একবার তিনি খলীফা উমর ইবনে আব্দিল আযীযের দরবারে বসেছিলেন; এমন সময় এক লোক ইয়াজিদকে ‘আমীরুল মো’মেনীন’ খেতাবে সম্বোধন করে। এতে খলীফা (রাগান্বিত হয়ে) তাকে বলেন, “তুমি এই ব্যক্তিকে ’আমীরুল মো’মেনীন’ বলো?” অতঃপর তিনি ওই লোককে ২০টি দোররা মারার আদেশ দেন। ৬৩ হিজরীতে ইয়াজিদ জানতে পারে যে মদীনাবাসী মুসলমানবৃন্দ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাই সে এক বিশাল সৈন্যবাহিনী পবিত্র নগরীতে প্রেরণ করে এবং মদীনাবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। পবিত্র “মদীনা মোনাওয়ারায় হামলা হলে পর কেউই নিরাপদ ছিলেন না। অসংখ্য সাহাবী ও অন্যান্য মানুষ শহীদ হন এবং মদীনায় লুঠপাট হয়; আর সহস্র সহস্র কুমারী মেয়েদের ধর্ষণ করে ইজ্জত নষ্ট করা হয়। ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন। … মহানবী (সাঃ) এরশাদ করেন: “মদীনাবাসীকে যে কেউ (সন্ত্রাসের মাধ্যমে) হয়রানি বা ভীত-সন্ত্রস্ত করলে আল্লাহ-ও তাকে অনুরূপ প্রতিদান দেবেন এবং তার ওপর আল্লাহর লা’নত, ফেরেশতাকুল ও মানব জাতির (মো’মেনদের) লা’নত” (মুসলিম শরীফ)। মদীনাবাসী মুসলমানবৃন্দ যে কারণে ইয়াজিদের বায়াত গ্রহণ করেননি, তা হলো সে ’অত্যধিক পাপাচারে লিপ্ত’ ছিল।

আল-ওয়াকিদী সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ বিন খাযলাতাল গুসাইল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: “আল্লাহর শপথ! আমরা ইয়াজিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছি যখন আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে ‘আমাদের প্রতি আসমান থেকে পাথর নিক্ষেপ করা হবে’; কেননা, ইয়াজিদি গোষ্ঠী তাদের মা, বোন ও কন্যাদের বিয়ে করা আরম্ভ করেছিল, প্রকাশ্যে মদ্যপান করছিল এবং নামাযও তরক করছিল।” ইমাম যাহাবী বলেন, ইয়াজিদ ‘মদ্যপান ও অন্যান্য কুকর্মে লিপ্ত’ হবার পর মদীনাবাসীদের প্রতি জুলুম-নিপীড়ন করলে মক্কাবাসী মুসলমানবৃন্দও চারদিক থেকে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। আল্লাহতা’লা ইয়াজিদের জীবনে কোনো রহমত-বরকত দেননি।(ইয়াজিদ মক্কা আক্রমণ করে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রাঃ) আনহুকেও শহীদ করে)।

সূত্রঃ ইমাম সৈয়ুতী প্রণীত:তারিখুল খুলাফা ১:১৬৭।

৬/ আল্লামা মাহমূদ আলূসী তাঁর কৃত তাফসীরে রূহুল মাআনী কেতাবে সূরা মুহাম্মদ এর ২২-২৩ নং আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় বলেন

“ইয়াজিদের প্রতি ‘লা’নত’ দেয়ার দালিলিক প্রমাণ এই আয়াত থেকেই বের করা হয়েছে, যেমনটি ইমাম আহমদ (রহঃ)-এর সূত্রে উল্লেখ করেছেন আল-বরযানজি (রহঃ) নিজ ‘আল-আশআত’ পুস্তকে এবং আল-হায়তামী তাঁর ‘আস-সাওয়াইক্ক’ গ্রন্থে এই মর্মে যে, ইমাম আহমদ (রহ:)-এর পুত্র আবদুল্লাহ তাঁকে ইয়াজিদের প্রতি লা’নত দেয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন। ইমাম সাহেব বলেন, ‘তার প্রতি লা’নত দেয়া যাবে না কেন, যেখানে স্বয়ং আল্লাহতা’লা-ই কুরআন মজীদে তাকে লা’নত দিয়েছেন?’ আবদুল্লাহ আবার প্রশ্ন করেন, ‘কিতাবুল্লাহর ওই আয়াতটি তেলাওয়াত করুন যাতে আমি জানতে পারি কীভাবে ইয়াজিদের প্রতি লা’নত দেয়া হলো?’ এমতাবস্থায় ইমাম আহমদ (রহঃ) নিম্নবর্ণিত আয়াতগুলো তেলাওয়াত করেন, ‘তবে কি তোমাদের এ লক্ষণ দৃষ্টিগোচর হচ্ছে যে তোমরা শাসনক্ষমতা লাভ করলে পৃথিবীতে বিপর্যয় ডেকে আনবে এবং আপন আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে? এরা হচ্ছে ওই সব লোক যাদের প্রতি আল্লাহতা’লা অভিসম্পাত (লা’নত) দিয়েছেন…’ (আল-কুরআন, ৪৭:২২-২৩)। অতঃপর তিনি বলেন, ‘ইয়াজিদ যা করেছে তার থেকে বড় বিপর্যয় আর কী হতে পারে’?”

সূত্রঃ আল্লামা আলূসী: রূহুল মাআনী, আত তাফসীর ৯ম খণ্ড, আল-কুরআন ৪৭:২২-২৩-এর ব্যাখ্যায়।

দ্বিতীয়তঃ আল্লামা আলূসী আরও বলেন,

“আর আমি বলি, আমার ভাবনায় যা প্রাধান্য পায় তা হলো এই খবীস (ইয়াজিদ) মহানবী (সাঃ) এর রেসালতের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়নি। আমার মতে, ইয়াজিদের মতো লোককে লা’নত দেয়া সঠিক, যদিও তার মতো এতো বড় ফাসিকের কথা কল্পনা করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়; আর এটাও স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে সে কখনোই তওবা করে নি; (উপরন্তু) তার তওবা করার সম্ভাবনাও তার ঈমান পোষণ করার সম্ভাবনার চেয়ে ক্ষীণতর। ইয়াজিদের পাশাপাশি ইবনে যিয়াদ, ইবনে সা’আদ ও তার দল-বল এতে জড়িত। অবশ্য-অবশ্য কেয়ামত দিবস অবধি এবং ইমাম হুসাইনের জন্যে (মো’মেনদের) চোখের পানি যতদিন ঝরবে ততদিন পর্যন্ত আল্লাহর লা’নত তাদের সবার ওপর পতিত হোক; তাদের বন্ধু-বান্ধব, সমর্থক, দল-বল এবং ভক্তদের ওপরও পতিত হোক!”

সূত্রঃ আল্লামা আলূসী: রূহুল মাআনী, আত তাফসীর, ২৬:৭৩।

৭/ ইমাম যাহাবীর ভাষ্য

‘‘ইয়াজিদ ছিল এক জঘন্য নাসিবী (আহলে বায়েতকে ঘৃণাকারী) । সে রাজত্ব আরম্ভ করে ইমাম হুসাইনকে শহীদ করে এবং রাজত্বের ইতি টানে হাররা-এর ঘটনা দ্বারা (অর্থাৎ, মদীনা অবরোধ, যার দরুন সহীহ হাদীস মোতাবেক সে লা’নতের যোগ্য হয়)। ফলে মানুষেরা তাকে ঘৃণা করতো; অধিকন্তু সে জীবনে রহমত-বরকত কিছুই পায়নি; ইমাম হুসাইনের শাহাদাতের পরে তার বিরুদ্ধে অনেকে অস্ত্র তুলে নেন – যেমনটি করেছিলেন মদীনাবাসীগণ, যাঁরা আল্লাহর ওয়াস্তে (তার বিরুদ্ধে) রুখে দাঁড়ান।”

সূত্রঃ সিয়ার আল-আলম আন-নুবালা: ৪:৩৭-৩৮।

দ্বিতীয়তঃ ইমাম যাহাবী আরও লিখেন,

“আমি বলি, ইয়াজিদ মদীনাবাসীদের সাথে যে আচরণ করেছিল, এবং ইমাম হুসাইন ও তাঁর বংশধরদের যেভাবে হত্যা করেছিল, আর যেভাবে মদ্যপান ও গর্হিত কাজে লিপ্ত হয়েছিল, তাতে মানুষেরা তাকে ঘৃণা করতেন এবং তার বিরুদ্ধে একাধিকবার রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। আল্লাহতা’লা ইয়াজিদের জীবনে রহমত-বরকত দেননি; উপরন্তু, আবু বিলাল মিরদাস বিন আদইয়া আল-হানযালী তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।”

সূত্রঃ তারিখুল ইসলাম ওয়া তাবাকাত আল-মাশাহির ওয়াল আলম: ৫:৩০।

তৃতীয়তঃ ইমাম যাহাবী আরও লিখেন,

“যিয়াদ হারসী বর্ণনা করে: ‘ইয়াজিদ আমাকে মদ পান করতে দেয়। আমি ইতিপূর্বে কখনোই এ রকম মদ পান করিনি; তাই তাকে জিজ্ঞেস করি কোথা থেকে সে এই মদের উপাদান সংগ্রহ করেছে। ইয়াজিদ জবাবে বলে, এটি মিষ্টি ডালিম, ইসপাহানের মধু, হাওয়াযের চিনি, তায়েফের আঙ্গুর ও বুরদাহ-এর পানি দ্বারা প্রস্তুতকৃত।’ আহমদ ইবনে মাসামা বর্ণনা করেন: ‘একবার ইয়াজিদ মদ্যপান করে নাচা আরম্ভ করে; হঠাৎ সে পড়ে যায় এবং তার নাক দিয়ে রক্ত বেরুতে আরম্ভ করে’।”

সূত্রঃ সিয়ার আল-আলম আন-নুবালাহ: ৪:৩৭

৮/ ইয়াজিদ সম্পর্কে কাজী সানাউল্লাহ পানিপথী (রহঃ) এর ভাষ্য

মহান মুফাসসির ও সুবিখ্যাত গ্রন্থাবলীর প্রণেতা এবং সকল আহলে সুন্নার কাছে গ্রহণযোগ্য ইসলামী জ্ঞান বিশারদ কাজী সানাউল্লাহ পানিপথী (রহঃ) কুরআন মজীদের ১৪:২৮ আয়াতখানি উদ্ধৃত করেন:

“আপনি কি তাদেরকে দেখেননি যারা অকৃজ্ঞতাবশত আল্লাহর অনুগ্রহকে বদল করেছে এবং আপন সম্প্রদায়কে ধ্বংসের ঘরে নামিয়ে এনেছে?”

অতঃপর এর তাফসীরে হযরত পানিপথী (রহঃ) লিখেন,

“বনী উমাইয়া সব সময় কুফরীর ওপর উল্লাস প্রকাশ করেছিল; ইয়াজিদ ও তার সাথীরা আল্লাহর নেয়ামত (আশীর্বাদ) প্রত্যাখ্যান করে আহলে বায়তের প্রতি বৈরিতার পতাকা উড়ায়; আর শেষমেশ ইমাম হুসাইনকে শহীদ করে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে সে মহানবী (সাঃ) এর ধর্মকে অস্বীকার করে বসে। ইমাম হুসাইনের শাহাদাতের পরে সে বলে: ‘আমার পূর্বপরুষেরা বেঁচে থাকলে তাঁরা আজ দেখতেন কীভাবে আমি মহানবী (সাঃ) এর পরিবার ও বনী হাশেমের ওপর প্রতিশোধ নিয়েছি।’ সে এ কথা ব্যক্ত করতে যে দ্বিচরণ শ্লোক ব্যবহার করে তার শেষাংশে আছে – ’বদরের যুদ্ধে আহমদ (মহানবী সাঃ) আমার পূর্বপুরুষদের সাথে যা কিছু করেছেন, তার বদলা আমি নেবো’ (নাউযুবিল্লাহ)। সে মদ হালাল ঘোষণা করে এবং এর প্রশংসায় বলে, ‘যদি মুহাম্মদ (সাঃ)-এর ধর্মে মদ হারাম হয়, তাহলে ঈসা ইবনে মরঈয়মের (আঃ) ধর্মে একে জায়েয জেনো’।”

৯/  ইবনে কাসীরের ভাষ্য

ইবনে কাসীর তার রচিত ‘আল-বেদায়া’ গ্রন্থের ৮ম খণ্ডের ১১৬৯ পৃষ্ঠায় ‘যিকরে ইয়াজিদ বিন মোয়াবিয়া’ শীর্ষক অধ্যায়ে লিখেন: বিভিন্ন বর্ণনায় আমরা জানতে পারি যে ইয়াজিদ দুনিয়ার কুকর্ম পছন্দ করতো; মদ্যপান করতো, গান-বাজনায় ছিল আসক্ত, দাড়িবিহীন ছেলেদের সাথে সমকামিতায় লিপ্ত, ঢোল বাজাতো, কুকুর পালতো, ব্যাঙের, ভালুকের ও বানরের লড়াই লাগিয়ে দিতো। প্রতিদিন সকালে সে মদ্যপ অবস্থায় বানরকে ঘোড়ার পিঠের সাথে বেঁধে ঘোড়াকে দৌড় দিতে বাধ্য করতো।”

১০/  ইবনে আসীরের মন্তব্য

ইবনে আসীর নিজ ‘তারীখ আল-কামিল’ গ্রন্থের ৩য় খণ্ডের ৪৫০ পৃষ্ঠায় মুনযির ইবনে যাবীর থেকে বর্ণনা করেন: ‘‘এটি সত্য যে ইয়াজিদ আমাকে ১,০০,০০০ (এক লক্ষ) দিরহাম পুরস্কারস্বরূপ দিয়েছিল, কিন্তু এটি তার প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করা হতে আমাকে রুখবে না। আল্লাহর কসম, সে একজন মাতাল।”

১১/ মাতাল ইয়াজিদ সম্পর্কে ইবনে জাওযীর মন্তব্য

ইবনে জাওযী তাঁর ওয়াফা আল-ওয়াফা কিতাবে বলেন:

ইয়াজিদ তার চাচাতো ভাই উসমান বিন মুহাম্মদ বিন আবি সুফিয়ানকে মদীনার শাসক পদে নিয়োগ করে। উসমান উপহার সামগ্রীসহ এক প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে ইয়াজিদের কাছে তারই আনুগত্যের শপথ নেয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু প্রতিনিধি দলের প্রত্যাবর্তন শেষে এর সদস্যরা বলেন, ‘আমরা এমন এক লোকের সাথে সাক্ষাৎ করে এসেছি যার কোনো ধর্ম নেই; সে মদ্যপান করে, বাদ্যযন্ত্র বাজায়, গায়িকা (ভ্রষ্টা নারী) ও কুকুর সাথে রাখে। আমরা তার প্রতি আনুগত্যের শপথ প্রত্যাহার করে নেয়ার কথা ঘোষণা করছি।’ আবদুল্লাহ ইবনে আবি উমরু বিন হাফস মখযুমী বলেন, ‘ইয়াজিদ আমাকে উপহার সামগ্রী দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই লোক আল্লাহর একজন শত্রু এবং মদ্যপ। আমি যেভাবে আমার আমামা (পাগড়ী) মাথা থেকে সরিয়ে ফেলছি, ঠিক একইভাবে তার থেকে নিজেকে আলাদা করবো।”

সূত্রঃ ইবনে জাওযী: ওয়াফাউল ওয়াফা, ১:১০৩।

১২/ কুসতুনতুনিয়া-বিষয়ক হাদীসের অপব্যাখ্যার অপনোদন

‘‘তিনি মহানবী (সাঃ) কে বলতে শুনেছেন, ‘নৌযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আমার সাহাবীদের প্রথম দলটি বেহেশতী হবে।’ মহানবী (সাঃ) এর পর বলেন, ‘আমার সাহাবীদের মধ্যে প্রথম বাহিনী যারা (রোমক) সিজারের শহর (কুসতুনতুনিয়া তথা কনস্টানটিনোপোল/ইস্তাম্বুল) জয় করবে, তাদের গুনাহ মাফ করা হবে’।”

সূত্রঃ বুখারী:আস সহীহ, ৪র্থ খণ্ড, হাদীস – ১৭৫।

প্রথমতঃ সিজারের শহর জয়ী প্রথম বাহিনীর মধ্যে ইয়াজিদ ছিল না, যেমনটি আবু দাউদের সুনানে বর্ণিত সহীহ হাদীসে বিবৃত হয়েছে: হযরত আসলাম আবি ইমরান (রাঃ) বলেন, “আমরা কনস্টানটিনোপোল জয়ের উদ্দেশ্যে মদীনা হতে বের হই। আবদুর রহমান বিন খালেদ বিন ওয়ালিদ ছিলেন এই বাহিনীর প্রধান।”

সূত্রঃ আবু দাউদ: আস সুনান, ২য় খণ্ড, হাদীস নং ২৫১২; আলবানীও এই হাদীসকে সহীহ বলেছে তার তাখরিজ পুস্তকে।

ইমাম তাবারী নিজ তারিখ গ্রন্থে বলেন –

আবদুর রহমান বিন খালেদ বিন ওয়ালিদের সেনাপতিত্বে ৪৪ হিজরী সালে মুসলমান বাহিনী রোমে (কনস্টানটিনোপোল) প্রবেশ করেন এবং সেখানে গযওয়া (ধর্মযুদ্ধ) সংঘটিত হয়।

সূত্রঃ তারিখে তাবারী: ৪৪ হিজরীর ঘটনা, ৫:২১২ পৃষ্ঠা; কায়রোর দারুল মাআরিফ প্রকাশনী হতে প্রকাশিত।

অথচ ইয়াজিদ আরও বহু পরে ওখানে যায়। উপরন্তু, তাকে সেখানে পাঠানো হয়েছিল শাস্তিস্বরূপ; আর সে ওই প্রথমে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের প্রতি বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করেছিল।

ইমাম ইবনে আসীর (রহঃ) লিখেন: 

এই বছর, অর্থাৎ, ৪৯ বা ৫০ হিজরী সালে হযরত মোয়াবিয়া রোমের (কনস্টানটিনোপোল) উদ্দেশ্যে এক বিশাল বাহিনী প্রেরণ করে। সে এর দায়িত্বভার অর্পণ করে সুফিয়ান বিন আউফের প্রতি এবং তাঁর ছেলে ইয়াজিদকে ওই বাহিনীর সাথে যেতে বলে। কিন্তু ইয়াজিদ ‘অসুস্থ হওয়ার ভান করে এবং যেতে অস্বীকৃতি জানায়’। যোদ্ধারা যখন ক্ষুধা ও রোগ-ব্যাধিগ্রস্ত হন, তখন সে ব্যঙ্গ করে কবিতায় বলে, ‘ফারকুদওয়ানা-এ মহা গযবে তারা পতিত হয়েছে; তাদের জ্বর বা অন্য যা-ই কিছু হোক, তাতে আমার যায় আসে না। কেননা, আমি বসে আছি উচ্চ ফরাশে (ম্যাট্রেস); আর আমার বাহুবন্ধনে আছে উম্মে কুলসুম (ইয়াজিদের স্ত্রীদের একজন )।’

‘‘মোয়াবিয়া যখন এই কবিতার শ্লোক সম্পর্কে জানতে পারে, তখন সে ইয়াজিদকে শপথ গ্রহণ করতে ও কনস্টানটিনোপোলে সুফিয়ান ইবনে আউফের সাথে যোগ দিতে বাধ্য করে, যাতে করে ’সেও ইসলামের মোজাহিদদের মোকাবেলাকৃত কঠিন পরীক্ষার অংশীদার হতে পারে’ (এটি ইয়াজিদের প্রতি শাস্তি ছিল) । এমতাবস্থায় ইয়াজিদ অসহায় হয়ে পড়ে এবং তাকে যুদ্ধে যেতে হয়; আর মোয়াবিয়া তার সাথে আরেকটি বাহিনী প্রেরণ করে।”

সূত্রঃ তারিখে ইবনে আল-আসীর, ৩:১৩১ পৃষ্ঠা।

ইমাম বদরুদ্দীন আইনী (রহঃ) বলেন:

আমি বলি, অসংখ্য সাহাবী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হযরত সুফিয়ান ইবনে আউফ (রাঃ) এর অধীনে যুদ্ধে গিয়েছিলেন এবং ‘ইয়াজিদ ইবনে মোয়াবিয়ার নেতৃত্বে যাননি, কেননা সে তাঁদেরকে নেতৃত্বদানে অযোগ্য ছিল’।”

সূত্রঃ উমদাতুল কারী: শরহে সহীহ আল-বোখারী, ১৪/১৯৭-১৯৮।

কনস্টানটিনোপোলে সেনা অভিযানের সার-সংক্ষেপ নিম্নরূপ:

*প্রথম আক্রমণ পরিচালিত হয় ৪২ হিজরী সালে। দ্বিতীয় দফায় আক্রমণ হয় ৪৩ হিজরীতে এবং এর সেনাপতি ছিলেন হযরত বসর বিন আবি আরকা।

* তৃতীয় অভিযান পরিচালনা করা হয় ৪৪ হিজরী সালে এবং এটি নেতৃত্ব দেন আবদুর রহমান বিন খালেদ বিন ওয়ালীদ। পরবর্তী অভিযান ছিল ৪৬ হিজরীতে যার সেনাপতি ছিলেন মালিক বিন আবদির রহমান ও আবদুর রহমান বিন খালেদ বিন ওয়ালীদ।

* ৪৭ হিজরীতে পরবর্তী অভিযান পরিচালনা করেন মালিক বিন হোবায়রা ও আবদুর রহমান বিন কায়েমী।

৪৯ হিজরী সালে কনস্টানটিনোপোল তিনবার আক্রমণ করা হয়। আর সর্বশেষ ৫০ হিজরীতে যে অভিযান পরিচালিত হয় তাতে ইয়াজিদ যোগ দেয় ।

মোয়াবিয়া ইয়াজিদকে আটক করে সিজারের ওখানে পাঠায়, কারণ সে মোজাহিদীনবৃন্দের প্রতি বিদ্রূপ করতো। তাই শাস্তিস্বরূপ তাকে ওখানে পাঠানো হয়েছিল, জ্বেহাদের জন্যে নয়।

অতএব, ইয়াজিদ সপ্তম সেনা অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিল, প্রথম অভিযানে নয় । আর বোখারী শরীফে উল্লেখিত হয়েছে, আমার উম্মতের মধ্যে সিজারের নগরী আক্রমণকারী প্রথম সেনা দলের পাপ-পঙ্কিলতা মাফ করা হবে।”

সূত্রঃ আল-বেদায়া ওয়ান্ নেহায়া, ইবনে খালদুনের ইতিহাস, ইমাম ইবনে আসীরের ইতিহাস

১৩/ ইয়াজিদের কুরআন প্রত্যাখ্যান

নিম্নের কিতাবগুলোতে ইয়াজিদের কুরআন প্রত্যাখ্যানের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। বিস্তারিতর জন্য নিম্নের সূত্রগুলো দেখুন-

১. আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া ৮ম খণ্ড, ২০৪ পৃষ্ঠা, যিকর রাস আল-হুসাইন

২. মিনহাজ আস সুন্নাহ ২য় খণ্ড, ২৪৯ পৃষ্ঠা, যিকর ইয়াজিদ

৩. শরহে ফেকাহে আকবর, ৭৩ পৃষ্ঠা, যিকর ইয়াজিদ

৪. শরহে তাফসীরে মাযহারী, ৫ম খণ্ড, ২১ পৃষ্ঠা, সূরাহ ইবরাহীম

৫. শাযরাহ আল-যাহাব, ৬৯ পৃষ্ঠা, যিকরে শাহাদাতে হুসাইন

৬. মাকাতাহিল হুসাইন ২য় খণ্ড, ৫৮ পৃষ্ঠা, যিকরে শাহাদাতে হুসাইন

৭. তাযকিরায়ে খাওওয়াস, ১৪৮ পৃষ্ঠা

৮. তারীখে তাবারী ১১তম খণ্ড, ২১-২৩ পৃষ্ঠা, যিকর ২৮৪ হিজরী

৯. তাফসীরে রূহুল মা’আনী (সূরা মোহাম্মদ)

১৪/ তাফসীরে রূহুল মাআনী গ্রন্থটি ইয়াজিদকে কাফের ঘোষণা করে

আল্লামা আলূসী বলেন,

অপবিত্র ইয়াজিদ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর রেসালতকে অস্বীকার করেছিল। মক্কা মোয়াযযমা ও মদীনা মোনাওয়ারার মুসলমান সর্বসাধারণ এবং মহানবী (সাঃ) এর পরিবার সদস্যদের প্রতি যে (অসভ্য ও বর্বর) আচরণ সে করেছিল, তাতে প্রমাণ হয় যে সে কাফের (অবিশ্বাসী) ছিল।”

খলীফা উমর ইবনে আব্দিল আযীযের দরবারে একবার মানুষেরা ইয়াজিদ সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। এমন সময় মানুষের মধ্যে কেউ একজন ইয়াজিদকে ‘আমীরুল মোমেনীন’ বলে সম্বোধন করে। এতে খলীফা রাগান্বিত হয়ে ওই লোককে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি (দুশ্চরিত্র, দুরাত্মা) ইয়াজিদকে আমীরুল মোমেনীন হিসেবে ডাকো?’ অতঃপর খলীফা উমর ইবনে আবদিল আযীয ওই লোককে ২০টি দোররা মারার নির্দেশ দেন।

সূত্রঃ  তাহযিবুত্ তাহযিব: ১:৩৬১ পৃষ্ঠা।

১৫/ ইয়াজিদের প্রতি লানত তথা অভিসম্পাত দেয়ার প্রমাণ

ইয়াজিদের প্রতি অভিসম্পাত দেয়ার প্রমাণ বের করা হয়েছে নিম্নবর্ণিত আয়াতটি থেকে যা আল-বরযানজি নিজ ’আল-আশয়াত’ কেতাবে এবং ইমাম হায়তামী তাঁর ‘আস সাওয়াইক’ পুস্তকে বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমদ (রহঃ) হতে এই মর্মে যে, ইমাম সাহেবের পুত্র আবদুল্লাহ ইয়াজিদের প্রতি লা’নত বর্ষণের পক্ষে কুরআন মজীদের কোথায় প্রামাণ্য দলিল আছে সে ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞেস করেন। ইমাম আহমদ (রহঃ) এর পক্ষে উদ্ধৃত করেন আল-কুরআনের বাণী: “তবে কি তোমোদের এ লক্ষণ দৃষ্টিগোচর হচ্ছে যে তোমরা শাসনক্ষমতা লাভ করলে পৃথিবীতে বিপর্যয় ডেকে আনবে এবং আপন আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে? এরা হচ্ছে ওই সব লোক যাদের প্রতি আল্লাহতা’লা অভিসম্পাত (লা’নত) দিয়েছেন…” (৪৭:২২-২৩)। বস্তুতঃ ইয়াজিদ যে অপকর্ম করেছে, তার থেকে বড় কোনো ফিতনা আর হতে পারে কি?

সূত্রঃ আল্লামা আলূসী: রুহুল মাআনী, আত তাফসীর, ৯ম খণ্ড, সূরা মোহাম্মদ আয়াতঃ ২২-২৩