সুন্নি হাদিস অনুযায়ী কুরআন-এ সংযোজন

ভুমিকাঃ
প্রথমেই একথা বলে রাখতে চাই যে এই প্রবন্ধ  লেখার  উদ্দেশ্য এ নয় যে, কুরআনে তাহরিফ (পরিবর্তন) হয়েছে এ কথা প্রমাণ করা, বরং কিছু অশিক্ষিত মানুষ যখন না জেনেশুনে এরূপ মিথ্যা প্রপাগান্ডার ফাঁদে পা দেয় যে, শিয়ারা কুরআনে তাহরিফ হয়েছে বলে মানে তাই তাঁরা কাফের; আর এই কথার প্রমাণে তাঁরা শিয়া কুতুব-এ-হাদিস থেকে কিছু হাদিসও তুলে ধরে। এই বই লেখার উদ্দেশ্য এই মিথ্যা প্রপাগাণ্ডার উত্তর দেওয়া। কুরআনে তাহরিফ বিষয়টি আমরা কখনই তুলে ধরতে চাইনা কারণ এতে ইসলামের শত্রুদের ছাড়া কারও উপকার হবে না। আমাদের এই নীরবতাকে দুর্বলতা ভাবা হয়! বাধ্য হয়ে তাই সরব হতে হল।

যেমন ইদানীং কিছু আলোচনায় এই ধরনের অপপ্রচার লক্ষ্য করা গিয়েছে। ফলে আমার কিছু ভাইয়ের অনুরোধে এই সংকলন প্রকাশ করার প্রয়াস পেলাম। কিন্তু আল্লাহর রহম যে, শিয়া ও সুন্নি উভয়ই কুরআনে কোনও ধরনের পরিবর্তনকে মানেনা। আশা করি এই প্রবন্ধের  মাধ্যমে অনর্থক তাকফিরি ফতোয়া বন্ধ হবে।

১) প্রথম অধ্যায় –সুন্নি হাদিস অনুযায়ী কুরআন-এ সংযোজন
২) দ্বিতীয় অধ্যায় – সুন্নি হাদিস অনুযায়ী কুরআনে বিযোজন
৩) তৃতীয় অধ্যায় – সুন্নি হাদিস অনুযায়ী কুরআনে ভুল

প্রথম অধ্যায়ঃ সুন্নি হাদিস অনুযায়ী কুরআন-এ সংযোজনঃ

আমরা এই অংশে সাহিহ সুন্নি হাদিস উল্লেখ করবো যার দ্বারা প্রমান হবে সুন্নিমত অনুসারে সাহাবা ও বড় বড় আলেমগন কুরআনে তাহরিফ হয়েছে বলে বিশ্বাস করতেন।

এক) ইবনে আব্বাসের মত অনুযায়ী বর্তমান কুরআন-এ ৫০ টি আয়াত বেশি আছে

আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি ইবনে আব্বাস এর থেকে বর্ণনা করেছেন।

“কুরাআন এ আয়াত এর সংখ্যা ৬৬১৬”

আল ইতকান ফি উলুম আল কুরাআন খন্ড ১,পাতা  ১৪৬ (স্ক্যনের জন্য ক্লিক করুন)

সুতরাং দেখুন এখন আমাদের হাতে যে কুরআন আছে আয়শার মতে তাতে মোট ৬৬৬৬ টি আয়াত আছে। উপরের হাদিস থেকে এ কথা পরিস্কার যে, হয় এখনকার কুরআন এ ৫০টি আয়াত বাড়ানো হয়েছে বা ইবনে আব্বাস(রাঃ) ৫০ টি আয়াত অস্বীকার করেছেন।

দুই) সুন্নি উলেমাদের মধ্যে মতবিরোধ কুরআন এর আয়াত সংখ্যা নিয়ে

আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি প্রাচীন সুন্নি উলেমা উসমান বিন সাইদ বিন উসমান আবু আমরূ আল ধানি (মৃঃ ৪৪৪ হিঃ)-এর বারাত দিয়ে লিখেছেন।

আল-ধানি বলেনঃ তাঁরা কুরআন এ ৬০০০ আয়াতের ব্যাপারে একমত কিন্তু বাকি আয়াতসমুহের ব্যাপারে মতভেদ আছে, কেউ কেউ এর বেশি আয়াত যোগ করেন নি, অন্যরা দু’শ চার টি যোগ করেছেন, আনেকে বলেছেন ২১৪ টি বেশি, যেখানে আরও আনেকে বলেছেন ২১৯ টি আয়াত বেশির কথা। কয়েকজন বলেছেন ২২৫টি আয়াত বেশি, অন্যান্যরা ২৩৬টি আয়াত বেশির কথা বলেছেন।“

(আল ইতকান ফি উলুম আল কুরাআন খন্ড ১,পাতা ১৪৭, স্ক্যানের জন্য ক্লিক করুন)

তিন) নাসিবিদের ইমাম ইবনে কাসিরের মতে ৬০০০ আয়াত , বাকিগুলি সন্দেহজনক???

নাসিবিদের ইমাম ইবনে কাসিরের মতে ৬০০০ আয়াত , বাকিগুলি সন্দেহজনক??? ইবনে কাসির তাঁর তাফসীর (খণ্ড ১,পাতা ৫০)-এ লিখেছেনঃ

“কুরআন এ মোট ৬০০০ আয়াত আছে, বাকি আয়াতসমুহের ব্যাপারে মতবিরোধ আছে। এ সমন্ধে বেশ কিছু মতামত আছে। এর একটি মত ৬২০৪ টি আয়াত।” (স্ক্যানের জন্য ক্লিক করুন

সুন্নিদেরকে অন্যের প্রতি আঙ্গুল উঠানোর আগে তাদের নিজেদের মাযহাবের আলেম-পণ্ডিতদের লিখিত বর্ণনা সমূহের উত্তর দিতে হবে।

আমারা যখন সুন্নি সাহিহ হাদিসে দেখি মাউযাতাইন (সূরা ফালাক আর সুরা নাস) এবং বিসমিল্লাহ কুরআন এর অংশ নয় তখন একথা জিজ্ঞাসা করতে বাধ্য হই যে, সুন্নিদের হাতে ‘মাউযাতাইন’ এবং ‘বিসমিল্লাহ’-যুক্ত যে-কুরআন আছে সেগুলি কি পবিত্র গ্রন্থে আতিরিক্ত? সুন্নি হাদিসের বর্ণনায় একথাও বলা হয়েছে যে, সুরা বাকারার সমান বড় সুরা হারিয়ে গিয়েছে! যদি হাদিস বই-এ কিছু বর্ণনা থাকার কারণে শিয়াদের কাফের বলা হয়, তবে সুন্নি হাদিস বই-এ হাদিস বর্ণনাকারী সেই সব খলিফা এবং সাহাবি ও উলামাদের উপরে কি ফতোয়া জারী হবে?

চার) হানাফি ও মালিকিদের মতে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” কুরআন এর অংশ নয়

আলোচনা আগে নিয়ে যাওয়ার আগে জেনে নেওয়া যাক নবী কারিম (সাঃ) এর হাদিসঃ

“আবু হুরাইরা বর্ণনা করেছেন নবী (সাঃ) বলেছেনঃ কেউ সুরা ফাতিহা পাঠ করলে যেন ‘বিসমিল্লাহির্ রাহমাননির রাহিম’ পাঠ করে, কেননা এটা কুরআনের মাথা, কেতাব এবং ‘সবে-মাসানি’র মাথা এবং ‘বিসমিল্লাহির্ রাহমানির্ রাহীম’ এর আয়াতসামুহের অংশ।”

[কানযুল উম্মাল খণ্ড ৭, পাতা ৪৩৭, হাদিস নং ১৯৬৬৫। (স্ক্যনের জন্য ক্লিক করুন)]

ইবনে হাজার আস্কালানি এটাকে সাহিহ সাব্যস্ত করেছেন তাঁর তালখিয আল হাবির গ্রন্থে (খণ্ড ১, পাতা ২৩৩)।

আসুন আরও দেখা যাক আমির আল মু’মিনীন আলি(আঃ) এর বানী যা জালালুদ্দিন সুয়ুতি তাঁর ইতকান (খণ্ড ১, পাতা ১৪৮)-এ সাহিহ সনদে লিখেছেন।

“কেউ আলিকে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ ‘সবে মাসানি’ কি? তিনি উত্তর দিলেন, ‘সুরা আল হামদ’। লোকটি বলল সুরা হামদ-এ ছটি আয়াত আছে। তিনি বললেন, ‘বিসমিল্লাহ হির রাহমান নির রাহিম’ একটা আয়াত”। (স্ক্যনের জন্য ক্লিক করুন)

হানাফি ও মালিকিদের “বিসমিল্লাহ…” সম্বন্ধে আকীদা আমারা নিম্নোল্লেখিত কেতাবসমূহ থেকে পাই।

১) তাফসির এ মাযহারি খণ্ড ১ পাতা পাতা ৩ – কাজী সানাউল্লাহ পানিপথি।
২) তাফসির এ কুরতুবি খণ্ড ১ পাতা ৯২ – ভুমিকাতে।
৩) তাফসির ফাতহুল কাদীর খণ্ড ১ পাতা ৭ –কাজী শাওকানি।
৪) তাফসের এ ইবন কাসির খণ্ড ১ পাতা ৭৪
৫) তাফসির আহকাম আল কুরআন আল জাসসাস।
৬) তাফসির আল কাবীর খণ্ড ১ পাতা ২০৩। 
৭) তাফসির আল কাশশাফ খণ্ড ১ পাতা ৯৯ – আল্লামা যামাকশারি।
৮) ঊমদাতুল কারী শারাহ সাহিহ বুখারি-খণ্ড ১ পাতা ১২।

তাফসির ইবনে কাসির-এ আমরা দেখিঃ
“অন্যদিকে মালিক আবু হানিফা এবং তাঁদের আনুসারিরা বলেছেন ‘বিসমিল্লাহ’ সুরা ফাতেহা বা অন্য কোনও সুরার অংশ নয়।” (বাংলা স্ক্যানের জন্য ক্লিক করুন)

তাফসির আল কাবীরঃ
“আর আবু হানিফা আল্লাহ তাঁর উপর রহম করুন, বলেছেন ‘বিসমিল্লাহ’ ইহার (সুরা ফাতেহা বা অন্য কোন সুরার) আয়াত নয়।” (স্ক্যানের জন্য ক্লিক করুন)

অন্যদিকে ইমাম শাফেইর মতে ‘বিসমিল্লাহির্ রাহমানির্ রাহীম’ কুরআনের অংশ। একথা সাবাই জানে যে, কুরআনের একটি আয়াত অস্বীকার করা বা কুরআনে একটি আয়াত যোগ করা কুফর।
সুতারং পাঠকগন ঠিক করুন কে কাফির।

এখন দেখা যাক ইমাম শাফেইর মতামতঃ

“মক্কা ও কুফার কুরআন পাঠকগণ বিস্মাস করত যে, এটা (বিসমিল্লাহ…) সুরাহ ফাতেহা ও অন্যান্য সুরারও আয়াত, ইমাম শাফেই ও তাঁর আনুসারিগণও একথা মনে করতেন, তাই তাঁরা এটা জোরে পাঠ করতেন।”

–তাফসির-এ-কাশশাফ  (স্ক্যানের জন্য ক্লিক করুন)

পাঁচ) সাহাবি ইবনে মাসুদের মতানুসারে সুরাহ ফাতিহা কুরআনের অংশ নয়। 

প্রিয় পাঠক আমারা সাবাই কুরআনের প্রথম সুরা হিসাবে ফাতেহা পাঠ করি, আর বাল্যকাল থেকে এই সুরা মুখস্ত করি। কিন্ত দুঃখের বিষয় সুন্নি হাদীস আনুসারে বিখ্যাত সাহাবি ইবনে মাসুদ সুরা ফাতিহাকে কুরআনের অংশ বলে অস্বীকার করেছেন।

এ বিষয়ে বিশদ জানার জন্য আমরা আহলে সুন্নাতের সম্মানিত কুতুব-এর আশ্রয় নিচ্ছিঃ

১) তাফসির আল কুরতুবি, খণ্ড ১, পাতা ১৫ এবং খণ্ড ১৯, পাতা ১৫১।
২) তাফসির আদ দুররে মনসুর খণ্ড ১, পাতা ২ ।
৩) তাফসির আল কবীর খণ্ড ১ পাতা ১৭৬।
৪) আল ঈতকান খণ্ড ১ পাতা ৮০।
৫) তাফসির ফাতহ আল কাদীর খণ্ড ১ পাতা ৭৫।
৬) ফাতহ আল বায়ান খণ্ড ১ পাতা ৩৩।

তাফসির ফাতহ আল কাদীর –(সাওকানি) তে আমরা পড়িঃ

كان عبد الله بن مسعود لا يكتب فاتحة الكتاب في المصحف ، وقال لو كتبتها لكتبت في اول كل شئ

“ইবনে মাসুদ তাঁর মুসাহাফ এ সুরাহ ফাতিহা লিখতেন না, তিনি বলেছেনঃ যাদি আমি লিখি তবে আমাকে সব কিছুর আগে লিখতে হবে” (স্ক্যানের জন্য ক্লিক করুন)

এখন দেখুন হাফিয ইবন হাজর আশকালানি তাঁর বিশ্ববিখ্যত বই ‘শারাহ বুখারি আল ফাতহুল বারি’তে কি লিখেছেন (খণ্ড৮, পাতা ৭৪৩), তিনি ইমাম নববীর উধৃতি দিয়েছেনঃ

أجمع المسلمون على أن المعوذتين والفاتحة من القرآن وأن من جحد منهما شيئا كفر.

“এটা মুসলমানদের ইজমা যে সুরাহ ফাতিহা এবং মাউযাতাইন কুরআনের অংশ, যে এটাকে মানবে না সে কাফের।” (স্ক্যানের জন্য ক্লিক করুন)

নোটঃ ইবনে হাজার, ইমাম নববী-এর উধৃতি দিয়ে, ইমাম নববী ইবনে মাসুদের ফাতিহাকে কুরআনের অংশ মানত না সেটার অস্বীকার করাকে রদ করেছেন ।

ইবনে মাসুদের সুরাহ ফাতিহা ও মাউযাতাইন কুরআনের অংশ হওয়াকে অস্বীকার করার আরও দলিল।
আমরা নিম্নলিখিত কিতাবসমুহের আশ্রয় নিচ্ছি –

১। ঈতকান ফি উলুম আল কুরআন খণ্ড ১ পাতা ৯৯।
২। তাফসির ইবনে কাসির খণ্ড ১ পাতা ৯।
৩। তাফসির ফাতহ আল কাদীর খণ্ড ১ পাতা ৬।
৪। তাফসির আল কবীর খণ্ড ১ পাতা ২১৮।

তাফসির আল কাবীরঃ

نقل في الكتب القديمة أن ابن مسعود كان ينكر كون سورة الفاتحة من القرآن وكان ينكر كون المعوذتين من القرآن

“পুরানো কেতাব সমূহে একথা লেখা আছে ইবনে মাসুদ সুরাহ ফাতিহা ও মাউযাতাইন কুরআন এর অংশ হিসাবে গণ্য করতেন না।” (স্ক্যানের জন্য ক্লিক করুন

আমরা প্রিয় পাঠকদের কাছে বিচারের আপিল করছি উপরের লেখা গুলি পড়ার পর,–যেখানে জানা যাচ্ছে ইবনে মাসুদ পরিস্কার ভাবে সুরা ফাতিহাকে কে কুরআন এর অংশ বলে মানতেন না, তখন তাঁরা কি শিয়াদের উপরে তকফিরি ফতয়া লাগাবেন শুধু মাত্র শিয়া কুতুব এ হাদিস এ এই ধরনের কিছু হাদিস থাকার কারনে!?

ছয়) ইবনে মাসুদ সুরা ফালাক ও সুরা নাসকে কুরআনের অংশ বলে মানতেন না।

সম্মানীয় সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদের মতামতকে আমরা আহলে সুন্না-এর মুল্যবান বই সামুহ থেকে তুলে ধরবো।

১) সাহিহ আল বুখারি খণ্ড কিতাব আত তাফসির।

২) ফাতহ আল বারী খণ্ড ৮ পাতা ৭৪২, কিতাব আত তাফসির।
৩) তাফসির দূররুল মনসুর খণ্ড ৬ পাতা ৪১৬।
৪) তাফসির ইবনে কাসির খণ্ড ৪ পাতা ১৭৫।
৫) তাফসির কুরতুবি খণ্ড ২ পাতা ২৫১।
৬) তাফসির এ রুহুল মা’নী খণ্ড ১ পাতা ২৭৯।
৭) তাফহীমুল কুরআন –মাউদুদি

মুহাদ্দিস হাফিয ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ফাতহুল বারীতেঃ

وقد أخرجه عبد الله بن أحمد في زيادات المسند والطبراني وإبن مردويه من طريق الأعمش ، عن أبي إسحاق ، عن عبد الرحمن بن يزيد النخعي قال : كان عبد الله بن مسعود يحك المعوذتين من مصاحفه ويقول : أنهما ليستا من كتاب الله

“আহমাদ মুসনাদে, তাবারানি, ইবনে মারদাওায়ই ‘আমাস এর মধ্যে দিয়েঃ ইবনে মাসুদ তাঁর মুসাহিফ ( কুরআন এর কপি)-এ মাউযাতাইন লিখতেন না। এবং বলতেন এগুলি কুরআনের অংশ নয়।” (স্ক্যানের জন্য ক্লিক করুন

স্বরণ করুন বিসমিল্লাহ ও সুরা ফাতিহা কুরআনের প্রথমে আর সুরাহ ফালাক নাস কুরআনের শেষে সুতারং যে মাযহাবের কুরআনের প্রথম আর শেষ সন্ধেও জনক সেই মাযহাব কিভাবে অন্য মাযহাব কে কুফরির ফতয়া দেয়?

লক্ষ্য করুন ঈমাম কুরতুবি তাঁর তাফসির এ কি লিখেছেন (খণ্ড ১, পাতা ৫৩)ঃ

قال يزيد بن هارونه المعوذتان بمنزلة البقرة وآل عمران ، من زعم انهما ليستا من القرآن فهو كاف

“মাউযাতাইন এর মর্যাদা সুরা বাকারা ও আলে ইমরান এর মতো, যেকেউ এটা কুরআনের অংশ হিসাবে মানে না সে কাফির।” (স্ক্যানের জন্য ক্লিক করুন)

ইবনে মাসুদ তাঁর মুসহাফ এ মাউযাতাইন (সুরা ফালাক ও নাস) লেখেননি।

আল্লামা হাফিয মুহাদ্দিস মুফাসসির মুজাদ্দিদ ও মুফাক্কির জালালুদ্দিন সুয়ুতি তাঁর মুল্যবান বই ‘আল ইতকান’-এ লিখেছেনঃ
“ইবনে মাসউদের মুসহাফ এ সুরাসমুহের ক্রম এই রকমঃ আল ইত্বওয়ালঃ আল বাকারা, আল নিসা, আলে ইমরান ……………কাউসার, কুল ইয়া আইয়ুহাল কাফেরুন, তাব্বাত, কুল হু আল্লাহু আহাদ, আলাম নাশরহ। কিন্তু ‘আল হামদ’ ও ‘মাউযাতাইন’ ওতে ছিলনা।” (স্ক্যানের জন্য ক্লিক করুন)

কিছু উলামা-এ-আহলে-সুন্না এই সমস্ত হাদীস দেখে নিজেদেরকে বাঁচাবার জন্য খোঁড়া যুক্তির আশ্রয় নিতে চেয়েছেন। আবার অল্প কিছু উলেমা এসব হাদীসকে অস্বীকার করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এই সমস্ত হাদীসই সহিহ সনদসহ প্রমানিত।

১) সাহিহ বুখারি ।
২) সাহিহ ইবনে হিব্বান খণ্ড ১০, পাতা ২৭৪, নং ৪৪২৯।
৩) ফাতহুল বারী খণ্ড ৮, পাতা ৭৪।
৪) আল ইতকান খণ্ড ১, পাতা ১৮১।
৫) আল বিদায়া ওয়াল নিহায়া –ইবনে কাসির খণ্ড ১, পাতা ৩৫৭। 
৬) মাজমাউল যয়াইদ খণ্ড ৭ পাতা ৩১১,৩১২ হাদিস নং ১১৫৬২।
৭) আল্লামা মাউদুদি তাফিমুল কুরআন সুরা ফালাক ও নাস এর অধ্যায়।

আহলে সুন্নাহর সবথেকে সাহিহ বই ‘সহিহ আল বুখারি’ থেকেঃ কিতাব আত তাফসিরের শেষ হাদিসঃ

“যির বিন হুবাইস থেকে বর্ণিতঃ আমি উবাই বিন কাব কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘ও আবুল মুনধির! তোমার ভাই ইবনে মাসুদ এই রকম এই রকম বলে (অর্থাৎ মাউযাতাইন কুরআনের অংশ নয়)’, উবাই বলল, ‘আমি আল্লাহের নবীকে এ বিষয় জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি বলেছেন ‘এগুলি আমার উপর নাযিল হয়েছে, আমি এগুলোকে পাঠ করি (কুরআনের অংশ হিসাবে)’, উবাই আরও বললেন সুতারং আমরা সেকথাই বলি যা আল্লাহর রসুল বলেছেন।” (স্ক্যানের জন্য ক্লিক করুন)

জালালুদ্দিন সুয়ুতি তাঁর ইতকানেঃ

“আহামাদ বিন হাম্বল যিয়ারাত আল মুসনাদে, তাবারানি এবং ইবনে মারদুউ আমাস মাধ্যম দিয়ে আবু ইশাক, আব্দুর রাহমান বিন ইয়াযিদ আন নাখাই বর্ণনা করেছেন ‘আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ তাঁর মুসহাফ এ মাউযাতাইন লিখতেন না আর এই মত দিতেন যে এই আয়াতগুলি কুরাআনের অংশ নয়।’ বাজ্জার এবং তাবারানিও অন্য জায়গাতে একই রাবিদের থেকে বর্ণনা করে বলেছেন ‘এই হাদিসের সব বর্ণনাগুলোই সহিহ’।” (স্ক্যানের জন্য ক্লিক করুন)

অনুরূপ ভাবে হাইসামি তাঁর ‘মাজমা আল যাওয়াইদ’-এ উল্লেখ করেছেনঃ

“আব্দুর রাহমান বিন ইয়াযিদ আন নখাই বলেছেন ‘আব্দুল্লাহ(ইবনে মাসুদ) মাউযাতাইনকে তাঁর কুরআনের কপি থেকে মুছে দিতেন আর বলতেন এটা আল্লাহর কিতাবের অংশ নয়’।“

এই হাদিসের সত্যায়ণ করে হাইসামি লিখেছেনঃ

رواه عبد الله بن أحمد والطبراني ورجال عبد الله رجال الصحيح ورجال الطبراني ثقات‏

“এটা আব্দুল্লাহ ইবনে আহমাদ এবং তাবারানি বর্ণনা করেছেন, আব্দুল্লাহর বর্ণনাকারীগন সাহিহর বর্ণনাকারী আর তাবারানির বর্ণনাকারীগন সিকাত।” (স্ক্যানের জন্য ক্লিক করুন)

ইমাম ইবনে হিব্বান তাঁর সহিহতে হাদিস লিখেছেনঃ

أخبرنا : محمد بن الحسن بن مكرم بالبصرة قال : ، حدثنا : داود بن رشيد قال : ، حدثنا : أبو حفص الأبار ، عن منصور ، عن عاصم بن أبي النجود ، عن زر بن حبيش قال : لقيت أبي بن كعب فقلت له : إن بن مسعود كان يحك المعوذتين من المصاحف ويقول : أنهما ليستا من القرآن فلا تجعلوا فيه ما ليس منه

যির ইবনে হুবাইস থেকে বর্ণিতঃ ‘আমি উবাই বিন ক’আবের সাথে দেখা করে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ইবনে মাসুদ তাঁর কুরআনের কপি থেকে মাউযাতাইন বাদ দিতেন এবং বলতেন “ এইদুটি কুরআনের অংশ
নয়, এতে ( কুরআনে) এটা যোগ করো না যেটা এর( কুরআনের) অংশ নয়………..” (স্ক্যানের জন্য ক্লিক করুন)

( হাদিসটা একটু লম্বা উপরের বুখারি এর হাদিস এর সাথে মিলিয়ে পড়ুন।)

আল্লাম মাউদুদি তাঁর তাফিমুল কুরআনে সুরা নাস ও ফালাক এর অধ্যায়ে লিখেছেনঃ

“কারণ ইবনে মাসুদ এ সুরা দুটির কুরআনের সুরা হওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন, এ কথা নির্ভরযোগ্য সনদের মাধ্যমে প্রমাণিত। ইমাম নববী, ইমাম ইবনে হযম, ইমাম ফখরুদ্দিন রাযি প্রমুখ অন্য কতিপয় মনীষী ইবনে মাসুদ যে এধরনের কোন কথা বলেছেন, একথাটাকে সরাসরি মিথ্যা ও বাতিল গণ্য করেছেন। কিন্তু নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সত্যকে সনদ ছাড়াই রদ করে দেওয়া কোনও সুস্থ জ্ঞানসম্মত পদ্ধতি নয়।” (স্ক্যানের জন্য ক্লিক করুন)

ইবনে হাজার আশকালানি ও অনুরুপ ভাবে অস্বীকারকারীদের কথাকে খণ্ডন করেছেন। এই কথা আহলে সুন্নাহের কেতাব থেকে প্রমানিত যে ইবনে মাসুদ রাঃ সুরাহ ফাতেহা ও সুরা ফালাক ও নাস কুরানের অংশই নয়। সামান্য কিছু উলেমা এই হাদিস গুলি ইনকার করেছে ( মুনিকারে হাদিস হয়েছে) অন্যান্যরা তাদেরকে রদ করেছেন এবং এই বর্ননাগুলিকে সত্য বলেছেন। কিন্তু তার পরে নানা ভাবে চেস্টা করেছেন যাতে ইবনে মাসুদ রাঃ এর কে এটা থেকে বাচানো যায়। যেসব যুক্তি এনেছেন সেগুলির সার সংক্ষেপ করলে হাস্যকর এক অবস্থা দাড়ায়। লজিক্যালি ব্যাক্যটা এই রকম দাঁড়ায়।

“ইবনে মাসুদ রাঃ ফাতেহা ও মাউজাতাইন কুরানের অংশ মানতেন না, কিন্তু মানতেন। ইবনে মাসুদ রাঃ সুরা ফাতেহা ও মাওজাতাইন কুরানের অংশ মানতেন, কিন্তু মানতেন না”।
যা এক হাস্যকর জগাখিচুড়ি কথাবার্তা।

সাত) কিছু সাহাবী বিশ্বাস করতেন যে সুরা লাইল-এ শব্দ যোগ করা হয়েছে। বুখারি এ কথা আনুমোদন করেছেন

সহহি আল বুখারি খণ্ড কিতাব ‘তাফসির এ কুরআন’ সুরা লাইল, বাব وَمَا خَلَقَ الذَّكَرَ وَالْأُنْثَى

“আব্দুল্লাহ (ইবনে মাসুদ)-এর সাহাবীগণ আবু দারদার কাছে এসেছিলেন, (তাঁরা তাঁর বাড়িতে পৌঁছবার আগে) তিনি তাঁদের খুঁজে নিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন ‘তোমাদের মধ্যে কে আব্দুল্লাহর মতো পড়তে (কুরআন) পারো?’ তাঁরা বললেন ‘আমরা সবাই’, তিনি জিজ্ঞেস করলেন ‘তোমাদের মধ্যে কে মুখস্থ জানে?’ তাঁরা আলকামার দিকে ইঙ্গিত করল, তখন তিনি আলকামাকে জিজ্ঞেস করলেন ‘তুমি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদকে সুরা আল লাইল পড়তে কেমন শুনেছ?’ আলকামা পড়লেন “والذكر والأنثى”, আবু দারদা বললেন ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আমি নবী সাঃ কে এই রকম পড়তে শুনেছি, কিন্তু লোকেরা চায় যে আমি এই রকম পড়ি وَمَا خَلَقَ الذَّكَرَ وَالْأُنثَى ওয়াল্লাহি আমি ওদেরকে অনুসরণ করব না।” (স্ক্যানের জন্য ক্লিক করুন)

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ এর সাহাবিগণ বা আবু দাররা ছাড়া আজ সারা মুসলিম জগত সুরা লাইল এর ৩ নং আয়াত এই রকম পড়ে وَمَا خَلَقَ الذَّكَرَ وَالْأُنثَى

সুতারং সুন্নি হাদিস অনুযায়ী একথা স্পষ্ট যে, পবিত্র কুরআনে مَا خَلَقَ শব্দ দুটি যোগ করা হয়েছে! 

যাঁরা শিয়াদেরকে কাফের বলেন তাঁরা এখন এ-বিষয় কি বলতে চান?

আট) সাহাবী উবাই বিন কা’ব এর মুসহাফ এ কিছু শব্দ নেই যা এখন কার কুরআনে আছে।

আমরা সুরা আল নিসার ১০১ নং আয়াত এ পড়িঃ

وَإِذَا ضَرَبْتُمْ فِي الْأَرْضِ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَقْصُرُوا مِنَ الصَّلَاةِ إِنْ خِفْتُمْ أَنْ يَفْتِنَكُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنَّ الْكَافِرِينَ كَانُوا لَكُمْ عَدُوًّا مُبِينًا

তাফসির দুররুল মনসুর খণ্ড ৪, পাতা ৬৫৪ঃ

وأخرج ابن جرير وابن المنذر عن أبي بن كعب أنه كان يقرأ فاقصروا من الصلاة أن يفتنكم الذين كفروا ولا يقرأ إن خفتم وهي في مصحف عثمان إن خفتم أن يفتنكم الذين كفروا

“ইবনে জরির ও আবি মুনযির, উবাই ইবনে কা’ব থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (উবাই ইবনে কা’ব) এই আয়াতটি পড়তো <‘যদি তোমরা সালাত কসর করো, যে কাফেররা ক্ষতি করতে পারে’>, <যদি তোমরা ভয় করো, إن خفتم > এই অংশটি বাদ দিয়ে। অথচ উসমানের মুসহাফ-এ আছে <‘তোমরা সালাত কসর করো, যদি তোমরা ভয় করো যে কাফেররা ক্ষতি করতে পারে’>।” (স্ক্যানের জন্য ক্লিক করুন

সুন্নি বর্ণনা অনুযায়ী একথা স্পস্ট যে সাহাবী উবাই বিন কাব <যদি তোমরা ভয় করো, إن خفتم > পড়তেন না। এ কথাও স্পষ্ট যে উসমানের মুসহাফ-এ এটা বাড়ানো হয়েছে বলে সুন্নিদের অভিযোগ!

সুতরাং যারা শিয়া কুতুব এ হাদিস থেকে কিছু হাদিস তুলে ধরে শিয়াদেরকে কাফের প্রতিপন্ন করতে চান তাঁরা কি এইসব সাহাবী, তাবেইন ও তাবেতাবেইনদের উপর ও তাকফিরি ফতোয়া দেবেন?

রেফারেন্স সমূহের স্কান দেওয়া হল। কিছু ক্ষেত্রে পাতা নং বদলে গিয়েছে প্রকাশনা গুলোর বিভিন্নতার কারণে।