ইমাম হুসাইন (আঃ) কে কারা হত্যা করেছে? – ১

(ওহাবি, নাসেবীদের ও আহলে সুন্নাহদের প্রপাগন্ডার জবাব)

বিইসমি রব্বি হুসাইন। সালাওয়াত আলা মুহাম্মাদ ও আলে মুহাম্মাদ ওয়া লাআন আলা আদাইহিম।

নোটঃ (১) এই প্রবন্ধের প্রধান উদেশ্য ইয়াজিদি,নাসেবী, আহলে হাদিস, তাবলীগি ও কিছু আহলে সুন্নাহর প্রপাগান্ডার জবাব দেওয়া। আহলে সুন্নাহর বেশির ভাগ আলেম ইয়াজিদকে পছন্দ করেনা। সুতারং এই প্রবন্ধে যেখানে আহলে সুন্নাহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে সেটা তাদের উদ্দেশ্যে যারা ইয়াজিদকে নির্দোষ মনে করে।

(২) এই প্রবন্ধে আরবি মুল উধৃতি কম ব্যবহার করা হয়েছে কলেবর ছোট রাখার জন্য।

হুসাইন (আঃ) ও কারবালার ঘটনা নিয়ে লেখার দরকার পড়ে না কারণ হুসাইন (আঃ) এর ব্যাপারে ইতিহাস খুবই পরিষ্কার এবং ইয়াজিদের ফাসিক ও পালিত হওয়ার পক্ষে আহলে সুন্নাহর, আহলে হাদিসদের আলেমদের মধ্যে কোন ধরনের দ্বিমত নেই। কিন্তু বর্তমানের আহলে হাদিসের মধ্যে ইয়াজিদি ঢুকে পড়েছে যারা সৌদি সুফিয়ানি রাজার তপ্লি বাহক। এরা নিজেদেরকে আহলে সুন্নাহ বলে পরিচয় দিয়ে মানুষকে ধোঁকা দিয়ে ইয়াজিদি বানাবার চেস্টা করে। আহলে হাদিসের এক আলেম আক্ষেপ করে বলেছেন যে -আমরা আহলে হাদিস সব সময় সহিহ হাদিস নিয়ে কথা বলি কিন্তু আমাদের মধ্যে থেকে কিছু বার হয়েছে তারা হুসাইন ও কারবালার ক্ষেত্রে এই উসুল ভুলে যায় এবং (হুসাইন বিরোধিদের) বানানো কাহিনী নিয়ে গপ্প করতে থাকে।

যাইহোক এই প্রবন্ধে নাসেবী ইয়াজিদিদের তথাকথিত বিভিন্ন অপপ্রচার ও আধা প্রচারের জবাব দেওয়া হবে আহলে সুন্নাহর ইতিহাস, হাদিসের এবং আহলে সুন্নার বিভিন্ন বিখ্যাত ইমামদের বক্তব্যের আলোকে।

প্রবন্ধ শুরু করার আগে নাসেবিরা যেটা বলে তা এক কথায় সংক্ষেপে নিচে দেওয়া হলঃ

নাসেবীরা বলার চেস্টা করে তারা ইমাম হুসাইন (আঃ) এর শাহাদতে বেদনাগ্রস্থ। (এটা লোকদেরকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য বলে) অথচ তাদের সমস্ত লেখা লিখিতে এটা প্রমান করতে ব্যাস্ত হয় যে ইমাম হুসাইন (আঃ) এর খুরুজ (মদিনা থেকে বার হওয়া) ভুল ও ইমাম হুসাইনের হত্যায় ইয়াজিদ দোষী নয় এবং অনেকে আরো এক ধাপ এগিয়ে ইয়াজিদকে ইসলামের মহানায়ক হিসাবে তুলে ধরার চেস্টা করে।

আরো কিছু অতি উৎসাহিত নাসেবি বলতে থাকে যে শিয়ারা ইমাম হুসাইন (আঃ) কে হত্যা করেছে। ইমাম হুসাইন (আঃ) ও কারবালার ঘটনায় আহলে সুন্নাহ ও নাসেবীরা মুলতঃ দুটি কথা বলার চেস্টা করেঃ

১) ইয়াজিদ ইমাম হুসাইন (আঃ) কে হত্যা করেনি।

২) ইমাম হুসাইন (আঃ) কে শীয়ারা হত্যা করেছে।

এগুলোর উত্তরের জন্য এই প্রবন্ধকে নিম্নোক্ত কয়েক ভাগে ভাগ করা হবে।

১) ততকালীন যুগের শিয়া পরিচিতি ও কুফার জনগনের আকীদা।

২) ৬১ হিজরিতে কুফায় শীয়াদের অবস্থা ও ইয়াজিদের (লাঃ) বায়াত এবং ইমাম হুসাইন আঃ এর মদিনা ত্যাগ।

৩) কুফা থেকে কারা চিঠি লিখেছিল তাদের পরিচয়। খাস ও আমা এবং তাদের মধ্যে কারা হুসাইন (আঃ) এর জন্য জীবন দিয়েছিল ও কারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল এবং সেই সময়ে কুফার পরিস্থিতি।

৪) ইমাম হুসাইন (আঃ) ও নবী পরিবারের হত্যায় ইয়াজিদ, সাহাবা, সাহাবাদের পুত্ররা ও উসমানের ধর্মের লোকেরা সহ কারা জড়িত ছিল তার প্রমাণ। এই সব হত্যাকারিদের সাথে আহলে সুন্নাহ ও নাসেবীদের সখ্যতা।

৫) ইয়াজিদ লানাতুল্লাহ আলাইহির চরিত্র ও কর্মকান্ড। আহলে সুন্নার বিভিন্ন আলেমদের মতামত।

৬) নাসেবী আহলে হাদিসি, নজদি ও আহলে সুন্নাহর বিভিন্ন মিথ্যা প্রপাগান্ডা ও প্রশ্নের জবাব।

১)  তৎকালীন যুগে শিয়া পরিচিতি ও কুফার জনগনের আকীদা।

তৎকালীন যুগে শিয়া কোন আলাদা ভাবে মাজহাব হিসাবে দেখা হত না যদিও আসল মুহাম্মাদি ইসলামের আকীদার শিয়া ছিল। ইতিহাসে শিয়া শব্দের প্রচুর ব্যবহার হয়েছে, তার সবগুলি প্রায় দল বা অনুসারি হিসাবে উল্লেখ হয়েছে, যেমন মুয়াবিয়ার শীয়া, উসমানের শীয়া, ইয়াজিদের শীয়া, আলীর শীয়া, হাসানের শীয়া। আমার শীয়া, ওমুকের শীয়া তমুকের শীয়া। অর্থাৎ মুয়াবিয়ার দল, অমুকের দল, আলীর দল ইত্যাদি।

আকায়েদে শীয়া যাদের সমন্ধে কুরআন ও হাদিসে বলা হয়েছে তারা আলী (আঃ) এর সাথে নবী (সাঃ) এর যুগ থেকেই থাকত। সব ব্যাপারে আলী (আঃ) এর পক্ষ অবলম্বন করত। তারা আবু বকর, উমার ও উসমানের খেলাফতকে বৈধ বলে মানত না তাঁদের কাছে রাসুল (সাঃ) পরে আলী (আঃ) একমাত্র বৈধ খেলাফতের অধিকারী ও হাদিসে সাকালাইন অনুযায়ী পরবর্তিতে আহলে বাইতের ইমামগনকে রাসুলের বৈধ খলিফা ও ইমাম মানত। এই আকীদার লোকেরা পরবর্তিতে শুধু শীয়া নামে পরিচিত যেটা ইসলামে একটা আকীদাগত ভাবে মাজহাব হিসাবে এখন গণ্য হয়। যা একমাত্র প্রকৃত মুহাম্মাদী ইসলামের ধারক।

অপর দিকে আম জনসাধারণ যারা খড়কুটোর মত, হাওয়া যেদিকে গড়ায় তারা সেই দিকে গড়ায় এবং আকীদাগত কোন বাধ্যবাধকতা নেই, এরা আবু বকর, উমার উসমানকেও বৈধ খলিফা মানে আবার আলী (আঃ) যখন মদিনায় খেলাফত পায় তখন ইসলামের খলিফা ও রাস্ট্র নায়ক হিসাবে তাঁকেও মানত, এই সুত্রে আলী (আঃ) এর সঙ্গ দিত এবং সিফফিনের যুদ্ধে আলীর দলে থাকে ও বাগী মুয়াবিয়ার বিপক্ষে ছিল। এদেরকেও আলির শিয়া বা আলির দলের লোক বলে সেই সময় ডাকা হত। শুধুমাত্র ভাষাগত প্রয়োগের পরিপেক্ষিতে, মুয়াবিয়ার বিপক্ষে আলির শীয়া বা দল। এরা পরে মুয়াবিয়া যখন রাজা হয় তখন মুয়াবিয়ার দলে চলে যায়, পরে বনি উমাইয়াদের রাজাদের দলে যায় বা উমাইয়াদের শিয়া হয়। পরবর্তিতে এরা সুন্নি হয়ে যায়।

শাহ আব্দুল আজিজ দেহলভী তার এন্টি শীয়া বই তোফা ইশনা আসারিয়াতে লিখেছেনঃ

এটা জানা দরকার যে প্রথম শীয়া (যারা সুন্নি ও তাফজিলিয়া ছিল) পুরানো দিনে তারা শীয়া নামে পরিচিত ছিল। যখন গুলাত ও রাফেজি এবং যাইদিয়া ও ইসমাইলিরা তাদের জন্য শীয়া নাম নিল, সুন্নি ও তাফজিলিয়া এই নামটাকে পছন্দ করলো না এবং এখান থেকে তারা আহলুল সুন্নাহ ওয়াল জামাহ নাম নিল। (পাতা ১৬)

যেহেতু আহলে সুন্নাহ নামটাই অনেক পরে মুয়াবিয়ার আমলে এসেছে সেই জন্য শাহ আব্দুল আজিজ প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, তারা আলির আঃ দলে ছিল। (কেননা একথা হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে আলী (আঃ) এর সাথে শত্রুতা রাখা লোকেরা জাহান্নামি) এবং নিজেদেরকে বাঁচানোর জন্য এক অতি হাস্যকর যুক্তি দিয়েছে তারা আগে শিয়া নামে পরিচিত ছিল পরে নাম বদলে নিয়েছে!!

উক্ত বইয়ের ২৭ নং পাতায় শাহ আব্দুল আজীজ আরো লিখেছেনঃ প্রথম শিয়া উপাধি সেসব মুহাজিরিন ও আনসারদের দেওয়া হয়েছিল যারা আলী কারামুল্লাহ ওয়াজহু’কে বায়াত দিয়েছিল। তারা তাঁর (আলির) খেলাফাতের বিসস্ত অনুসারি ছিল। তারা তাঁর সানিধ্যে থাকত, তারা সর্বদা তাঁর শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, এবং আলির নির্দেশাবলীকে অনুসরণ করে এসেছে। এরা সত্যকারের শীয়া ৩৭ হিজরিতে যার প্রকাশ হয়েছে

নোটঃ ৩৭ হিজরিতে ইমাম আলী আঃ মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল।

সুতারং যারা আলী (আঃ) কে খলিফা মানতো ও অনুসরণ করত তারা বিভিন্ন প্রকারের ছিল। আহলে সুন্নার আলেমগন আরও উল্লেখ করেছেন।

প্রথম যুগের উলামাদের কাছে শীয়াত মানে আলিকে উসমানের উপর প্রধান্য দেওয়া …… যদিও তারা শেইখাইনদের (আবু বকর উমার) কে তাদের (উসমান আলী) উপর প্রধান্য দিত(ইবনে হাজর আস্কালানী, তাহযিব আত তাহযিব, খন্ড পাতা ৮২)

যাহাবি তার মিযান আল তিদাল এর খন্ড ১ পাতা ৬ এ উল্লেখ করেছেনঃ

ওই সব দিনগুলিতে গুলাত শিয়া (উগ্র শীয়া) তাদেরকে বলা হত যারা উসমান, তালহা, যুবাইর, মুয়াবিয়া ও যারা আলির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে তাদেরকে ভ্রান্ত বলত ও নিন্দামন্দ করত। তারা এদের ব্যাপারে ভালো মতামত রাখত না। কিন্তু এখন গুলাত শীয়া বলতে তাদের বোঝায় যারা ওই সকল লোকদের প্রতি তাকফিরি করে ও শেইখাইনদের থেকে নিজেদের আলাদা করে

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা পরিষ্কার হল যে সেই সময় আহলে সুন্নাহ বা সুন্নি বলে কোন কিছু ছিল না, কিন্তু শিয়া ছিল এবং কয়েক প্রকার ছিল। যাদের বেশির ভাগ মাজহাব হিসাবে নয় যেমনঃ

১) পলিটিক্যাল শীয়াঃ যে কেউ আলী (আঃ) এর খেলাফাত মেনেছিল ঠিক যেমন ভাবে প্রথম তিন জনের খেলফাত বৈধ মানত এবং যে কেউ সিফফিনের যুদ্ধে মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে আলির পক্ষে ছিল এবং এদের মধ্যে ও প্রকার ভেদ ছিল যা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে।

২) ইমাম আলী (আঃ) রাসুল (সাঃ) কতৃক নিয়োগকৃত বৈধ খলিফা এবং সর্বক্ষেত্রে আলী (আঃ) হকের উপরে।

আরো এক প্রকার ছিল যারা ইমাম আলী আঃ এর বিরুদ্ধে ছিল এবং ইমাম আলী আঃ এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি।

পাঠকদের আবারো আবদুল আজীজ এর লেখাকে মনে করার আবেদন জানাচ্ছি যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন এটা জানা দরকার যে প্রথম শীয়া (যারা সুন্নি ও তাফজিলিয়া ছিল) পুরানো দিনে তারা শীয়া নামে পরিচিত ছিল। যখন গুলাত ও রাফেজি এবং যাইদিয়া ও ইসমাইলিয়ারা তাদের জন্য শীয়া নাম নিল, সুন্নি ও তাফজিলিয়া এই নামটাকে পছন্দ করলো না এবং এখান থেকে তারা আহলুল সুন্নাহ ওয়াল জামা নাম নিল।  অর্থাৎ এখন যারা সুন্নি তারা নিজেদের নাম বদলে নিয়েছে আগে তারা একধরণের আলীর শিয়া নামে পরিচিত ছিল। আজকের আহলে সুন্নাহর আকীদার প্রতি নজর দিলে দেখা যায় তারা প্রচন্ড ভাবে প্রথম তিন খলিফার ভক্ত ও মুয়াবিয়ারও ভক্ত যে কিনা ইমাম আলী (আঃ) এর শত্রু ছিল! এবং খেলাফতে রাসেদ এর বাগী ছিল। অর্থাৎ আজকের আহলে সুন্নাহর মধ্যে সেই যুগের পলিটিক্যাল শিয়া (যারা নিজেদের নাম বদলে নিয়েছ) এবং ওই সকল লোক আছে যারা মুয়াবিয়ার পক্ষের লোক ছিল।

অপরপক্ষে ইমাম আলী (আঃ) এর প্রকৃত আকাইদি শিয়া যারা ইমাম আলী (আঃ) এর পরে হাসান, হুসাইন ও তাঁর পরে আহলে বাইত (আঃ) দের ইমামগনকে প্রকৃত ইমাম ও খলিফা মানে।

প্রথম শ্রেনী যারা পরে নাম বদলে আহলে সুন্নাহ নাম নিয়েছে তারা সেই সময় সাধারণ ও পরম্পরা হিসাবে আলী (আঃ) এর খেলাফতে বায়াত হয়েছিল তারা যেহেতু আলী (আঃ) এর সাথে ছিল এবং আলী (আঃ) এর শিয়া নামেই পরিচিত ছিল তাই এখন অনেক সময় এরা দাবি করে যে তারাও আলীকে ভালবাসে। এটা এদেরকে প্রায়ই দাবী করতে দেখা যায়। আরো একটা পার্থক্য এই যে, এই নাম বদলে নেওয়া পলিটিক্যাল শিয়াদের আকীদা এটা নয় যে ইমাম আলি (আঃ) সহ আহলে বাইতের ইমামগনের বিরোধিতা করা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা কুফরি ও ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাওয়ার উপাদান। বরং এরা ইমাম আলী আঃ এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে সওয়াবের কাজ মনে করে যদিও তারা মুখে বলে যে তারা ভুল করেছিল এবং একটা করে সওয়াব দেয় যারা ইমাম আলী (আঃ) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল আর এটাকে ইজতেহাদি ভুল বলে চালাবার চেস্টা করে।

এই ইমাম আলী (আঃ) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধকারীদের সোওয়াব দেওয়া দল দাবি করে যে তারা ইমাম আলী (আঃ) ও আহলে বাইত (আঃ) দের কে ভালোবাসে। এই তথাকথিত ভালবাসার দাবীদার নাম বদলে নেওয়া লোকদের উদ্দেশ্যে আলী (আঃ) বলেছেনঃ

কিছু পলিটিক্যাল শিয়াদের বায়াত ভঙ্গ করার পরে মাওলা আলী (আঃ) বলেছেনঃ

কাল পর্যন্ত আমি তোমাদেরকে হুকুম দিচ্ছিলাম আর আজ আমাকে হুকুম দেওয়া হচ্ছে!আর কাল পর্যন্ত আমি লোকজনদেরকে খারাব কাজ থেকে বিরত হওয়ার কথা বলছিলাম আর আজ আমাকেই বলা হচ্ছে!! (খুতবা নং ২০৮)

কুফার পলিটিক্যাল শিয়াদের প্রতি বলেছেন যারা ইমাম আলী (আঃ) এর ডাকে সাড়া দেয়নিঃ

ও লোকজন যারা আমার কথা মান্য করেনা যখন আমি তাদেরকে নির্দেশ দেই আর তারা সাড়া দেয়না যখন আমি তাদেরকে ডাকি (খুতবা নং ১৮০)

উসমানের হত্যার পরে যারা ইমাম আলী (আঃ) এর প্রতি বায়াত করেছিল এবং সুযোগ বুঝে বায়াত ভঙ্গ করে ও নানা বাহানাবাজি কথা বলতে থাকে এবং পরে আলী (আঃ) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, যেমন জামাল যুদ্ধ। তাদের উদ্দেশ্যে মাওলা আলী (আঃ) বলেছেনঃ

যারা আবুবকর উমার ও উসমানকে বায়াত দিয়েছিল, তারা আমার বায়াত করেছে একই ভিত্তিতে যে ভিত্তিতে তারা তাদের (আবুবকর উমার ও উসমানকে) বায়াত দিয়েছিল। সুতরাং একই যুক্তিতে যারা উপস্থিত ছিল তারা তাদের বায়াতকে ফিরিয়ে নিতে পারে না আর যারা বায়াতের সময় অনুপুস্থিত ছিল তাদের এটা বলার অধিকার নেই যে এই বায়াত মূল্যহীন

সুতরাং এই শ্রেনীর লোক আলী (আঃ) এর বায়াত পরম্পরা হিসাবে করেছিল যা তারা আগের তিন খলিফাকেও করেছিল এবং সময় ও সুযোগ বুঝে আলী (আঃ) কে নানা ভাবে সমস্যায় ফেলার চেস্টা করত। এরাই পলিটিক্যাল শিয়া।

অপরদিকে যারা ইমাম আলী (আঃ) এর প্রতি আকীদাগত ভাবে বায়াত করেছিল তাদের কথা ও ভাবমুর্তি উল্লেখ করা হচ্ছে।

ইমাম আলী (আঃ) এর প্রতি বায়াত করে খুজাইমা ইবনে সাবিত বলেছেনঃ

আমরা এমন একজনকে বেছে নিয়েছি যাকে আল্লাহের রাসুল (সাঃ) আমাদের জন্য বেছেছেন। [আল মিয়ার ওয়া আল মুয়াজানাহ, আবু জাফার ইসকানি (মৃঃ ২৫০) পাতা ৫১]

আবু বকরের খিলাফত নিয়ে উমার যখন ইবনে আব্বাসকে কুরাইশদের প্রধান্যের যুক্তি দিচ্ছেল ও বনি হাশিমের হিংসার কথা বলছিল তখন ইবনে আব্বাস সেটাকে খন্ডন করে বলেনঃ

কুরাইশরা যদি ওটাই মেনে নিত যেটা আল্লাহ তাদের জন্য বেছেছেন, তবে অধিকার তাদেরই থাকত অপরিত্যাক্ত অহিংসা ভাবে। ( তাবারি, খন্ড ১৪ পাতা ১৩৭,১৩৮। ইং অনুবাদ)

সিফফিনের যুদ্ধের পরের ঘটনায় তাবারি আরো উল্লেখ করেছেনঃ ( খন্ড ১৭ পাতা ১১৭)

খারেজিরা যখন কুফা ত্যাগ করলো, আলির সাহাবী ও শীয়ারা তাঁর কাছে এসে বায়াত করল। তারা বলল আমরা তাদের বন্ধু যাদের সাথে আপনি বন্ধুত্ব করেন আর তাদের শত্রু যাদের সাথে আপনি শত্রুতা করেন

ইসকাফি তার আল মিয়ার ওয়া আল মুয়াজানাহ এর ১৯৪ পাতায় উল্লেখ করেছেনঃ

সাধারন লোকজন আলির প্রতি বায়াত করেছিল কেতাব ও সুন্নার পরিপেক্ষিতে আর আলির শিয়ারা তাঁর বন্ধুত্বের বন্ধু ও তাঁর শত্রুদের শত্রু হিসাবে বায়াত করেছিল

কুফার ইতিহাস ও সেখানকার লোকেদের আকীদাঃ

উমার তার খিলাফাত কালে ১৭ হিজরিতে কুফা শহর পত্তন (বন্দরনগরী) করেন এবং বকরি ও উমারিদেরকে সেখানে স্পেশাল ভাতা দিয়ে বসান। উপমহাদেশের মহান আলেম আল্লামা শিবলী নোমানী তার Omar The Great (আল ফারুক এর ইং অনুবাদ) এ উল্লেখ করেছেনঃ

যখন বেশ অনেক শহর জয় করা হল, সাদ বিন আবি ওক্কাস ওমারকে লিখলেন যে আরবরা নস্ট হয়ে যাচ্ছে, ওমার লিখে পাঠালো যে সাগর ও জমিনের হিসাবে একটা গুরুত্বপুর্ন জায়গা খুঁজতে। ফলে সুলাইমান হাফিজ একটা জায়গা দেখলেন ও তার নাম কুফা রাখলেন। এই শহর ১৭ হিজরিতে পত্তন (বন্দরনগরী) হয় এবং ওমর নিজেই নির্দেশ দেন চল্লিশ হাজার লোকের আবাসের ঘর বানাতে। হায়াজ বিন মালিকের তত্বাবধানে আরব গোত্রদের আলাদা ভাবে ঘর দেওয়া হয়। ওমর নিজেই বিশেষ ভাবে শহরের গঠন প্রণালীর ও পরিকল্পনার নির্দেশ দেয়………………………………… জামে মসজিদ চৌক ভীতের উপর এমন ভাবে গঠন করা হয় যেখানে একসাথে চল্লিশ হাজার লোক যেন নামাজ পড়তে পারে। (আল ফারুক, খন্ড ২ পাতা ৯৫)।

শীবিলী নোমানী আরো উল্লেখ করেছেনঃ

জামে মসজিদ ছাড়াও এক একটা গোত্রের জন্য আলাদা আলাদা মসজিদ বানানো হয় তাদের আবাস স্থল অনুযায়ী। যে সমস্ত গোত্ররা কুফাতে বসবাস শুরু করে তাদের মধ্যে বার হাজার লোক ইয়ামান থেকে ও আট হাজার নাজার বংশ থেকে। সেখানে আরো প্রচুর গোত্র বসবাস শুরু করে যেমন সালীম, সাকীফ, হামদান, বাজাব্লাহ, আবি আসাদ, আযদ, তামিম………।

উমারের জীবদ্দশ্যায় এই শহর মহত্বতায় ও চাকচিক্যতার এমন শিখরে পৌঁছায় যে খলিফা (ওমর) এটাকে ইসলামের মস্তক (শহর) বলেন। সত্যই এটা আরব ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিনত হয়। (আল ফারুক খন্ড ২ পাতা ৯৬)

সুতরাং উমর নিশ্চয়ই উমারের বিরোধী ইমামী শিয়াদের জন্য শহর তৈরি করেনি! নাসেবীরা নিশ্চয়ই এখনো সেই ঘরের মধ্যে আছে যে ওমর শহরে ৪০ হাজার লোকের মসজিদ শিয়াদের জন্য মসজিদ বানিয়াছে!?

ইতিহাসে আমরা এটা কোথাও পাইনা যে ইমাম হুসাইন (আঃ) এর শাহাদতের সময় কুফা শহরের অধিকাংশ অধিবাসীরা ইমামী শিয়া বা আলী (আঃ) এর আকাইদী শিয়া ছিল। বরং এটা পাওয়া যায় যে কুফার অধিকাংশ অধিবাসীরা উসমানের শিয়া ছিল। আহলে সুন্নাহর বিখ্যাত আলেম আল্লামা ইয়াকুত হামাভি তার বিভিন্ন শহর সমুহের উপর লিখিত বই মজমাউল বুলদান এ যেখানে কুফা নিয়ে আলোচনা করেছেন সেখানে কোথাও সামান্য ভাবে এ কথা বলেননি যে কুফার অধিকাংশ লোক ইমামী শীয়া ছিল।

কুফায় ইমাম আলী (আঃ) এর শত্রু পক্ষের তালহার সাপোর্টার ছিল। উসমানকে হত্যা করার পরে তালহা যুবাইর মক্কায় গেল তখনকার ইতিহাস তাবারি তুলে ধরেছেন। ( খন্ড ১৬ পাতা ৪৩)

উসমানের হত্যার চার মাস পরে তালহা যুবাইর মক্কায় গেল। ইবনে আমির এক ধনী ব্যাক্তি সেখানে ছিল, এবং ইয়ালা ইবনে উমাইয়া প্রচুর টাকা পয়সা ও ৪০০ টা উট নিয়ে হাজির হল। তারা আয়শার বাড়িতে হাজির হয়ে মত বিনিময় করে। আলির ওখানে গিয়ে যুদ্ধ করা হোক তারা বললো। মদিনার লোকেদের সাথে যুদ্ধ করার মত ক্ষমতা আমাদের নেই তাদের একজন বলল। বরং বসরা ও কুফাতে যাওয়া হোক। বসরায় তালহার অনুগামী ও সাপোর্টার আছে। সুতরাং তারা বসরা ও কুফার দিকে যেতে চাইল, আব্দুল্লাহ ইবনে আমির তাদেরকে অনেক টাকা ও উট দিল। ৭০০ লোক মক্কা ও মদিনা থেকে বের হল, আর লোকজন তাদের সাথে যুক্ত হল এবং সংখ্যা ৩০০০ হাজারে পৌঁছাল

সুতরাং বোঝা গেল যে কুফাতে আলী (আঃ) এর বিরোধী তালহার পৃষ্ঠপোষক ছিল যারা পক্ষান্তরে শেইখাইন ( আবুবকর ও উমরের) খেলাফতের ধ্বজাধারি (পতাকাঙ্কিত) ছিল।

এটা ইমাম আলী (আঃ) এর সময় যখন ইমামী শিয়া কুফাতে বসবাস করতে শুরু করে যখন ইমাম আলী (আঃ) কুফাতে নিজেই বসবাস করতে শুরু করেন এবং কুফাকে রাজধানী হিসাবে গন্য করেন।

সুতরাং ইমাম আলী (আঃ) এর খেলাফাতের শেষ পর্যন্ত কুফাতে দুই প্রকারের বা খুব পরিষ্কার ভাবে বললে বলা যায় তিন প্রকারের লোক ছিল।

১) ইমাম আলী (আঃ) এর শত্রু যারা তালহার পৃষ্ঠপোষক ছিল এবং যারা ওমরের সময় থেকে সুবিধাভোগী শ্রেনীর ছিল, ইমাম আলী (আঃ) ক্ষমতায় আসার পরে তাদের সুবিধাভোগে বাধা পড়ে।

২) ইমাম আলীর পলিটিক্যাল শিয়া যারা গতানুগতিক ভাবে বায়াত করে আসে, দেশ ও দশের নেতা হিসাবে।

৩) আলী (আঃ) এর আকাইদি শিয়া। বোঝাই যাচ্ছে যে তারা সংখ্যালঘু ছিল।

উপরে সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে আশাকরি পাঠকদের কাছে পরিষ্কার হয়েছে তৎকালীন যুগে শিয়া কি ভাবে ব্যবহার হত এবং শীয়া কয় প্রকার ছিল আর কুফার জনগণের আকীদা কি ছিল।

২) ৬১ হিজরিতে কুফায় শীয়াদের অবস্থা ও ইয়াজিদের (লাঃ) বায়াত ও ইমাম হুসাইন আঃ এর মক্কা প্রস্থান।

চুক্তির মাধ্যমে ইমাম হাসান (আঃ) যখন শাসন ক্ষমতা মুয়াবিয়ার পক্ষে দেন এবং মুয়াবিয়া একছত্র রাজা হয় এবং ২০ বছর সন্ত্রাসের শাসন কায়েম করে। এখানে মুয়াবিয়ার আমল থেকে ৬১ হিজরি পর্যন্ত শিয়াদের গণহত্যার ইতিহাস সামান্য আলোচনা করা হবে। শুধুমাত্র কুফার উপর আলোকপাত করা হবে ইয়ামান ও অন্যান্য জায়গাতে শিয়াদের উপর গণহত্যা, লুণ্ঠন, রাহাজানি, বন্দি করা ধর্ষন করা। (যা সব আজ আহলে সুন্নাহর খলিফা আবুবকর আল বাগদাদির আইএস আলকায়দা ইত্যাদি করছে) 

মুয়াবিয়া ক্ষমতায় এসে যেগুলি করেছিল।

সে জিয়াদ বিন সুমাইয়াকে নিজের ভাই বলে ঘোষণা দেয়। (আবু সুফিয়ানের অবৈধ ছেলে যে সুমাইয়ার গর্ভে হয়েছিল)।

জিয়াদ কুফায় থাকত আলী (আঃ) এর খিলাফত কালে, ফলে সে কুফার সমস্ত ইমামী শিয়ার সমন্ধে ভালো করে জানত।

পরিত্যক্ত জিয়াদ ইবনে সুমাইয়াকে মুয়াবিয়া ভাই বলে গ্রহন করায় জিয়াদ আপ্লুত হয়ে মুয়াবিয়ার অনুগত হয়ে গেল, মুয়াবিয়া তাকে কুফার গভর্নর নিযুক্ত করে।

শিয়া বিরোধী আহলে সুন্নাহর বিখ্যাত আলেম শাহ আব্দুল আজিজ দেহলভী তার তোহফা ইসনা আশারিতে লিখেছেন অবৈধ জিয়াদ মুয়াবিয়ার নির্দেশে প্রথমে নিজের কাজের মধ্যে আলির শীয়াদের প্রতি শত্রুতার প্রকাশ করল(পাতা ৪৮৪)

জিয়াদ ইবনে সুমাইয়া ও তার সহযোগীরা ইমামী তথা আকাইদি শীয়াদের নির্দয় ভাবে জবাই করে। (এই বিষয় জানতে যেকোন ইতিহাস থেকে মুয়াবিয়ার পিরিয়ডটা পড়ে নিতে পারেন)। নিচে কিছু রেফারেন্স উল্লেখ করা হলঃ

Ø আল বেদায়া ওয়া আন নেহায়া, ইবনে কাসীর।

Ø তারিখ এ কামিল, ইবনে আসাকির। খন্ড ৩ পাতা ২৪৫।

Ø তারিখ আর তাবারি, খন্ড ৬ পাতা ১৫৫।

Ø আল ইসতিয়াব, ইবনে আব্দুল বার। খন্ড ১ পাতা ১৩৮।

আল্লামা মুহাম্মাদ বিন আকীল তার আন নাসা আল কিফায়া পাতা ৭০ এ লিখেছেন জিয়াদ ইবনে সুমাইয়াকে মুয়াবিয়া কুফার জনগনের উপরে নিযুক্ত করে ও সাথে বসরাওকে জুড়ে দেয়। সে আলির সময় কুফায় থাকত ফলে সেখানকার সব (ইমামী) শিয়াদের জানত। সে (ইমামী) শিয়াদের টেনে বার করে এবং হত্যা করে, তাদের সন্ত্রস্ত করে, হাত পা কর্তন করে, পেরেক দিয়ে চোখ ফুঁড়ে দেয়, গাছে ফাঁসি দেয়, ইরাক থেকে বিতাড়িত করে ঘৃহহীন করে যতক্ষণ চেনাজানা (ইমামী) শিয়া ইরাকে অবশিষ্ট না থাকে

আলী (আঃ) এর শিয়া হুজর বিন আদি ও তার সাথীদের হত্যা।

হুজর বিন আদি ছিলেন সাহাবী এ রাসুল (সাঃ), একজন সম্মানিয় সাহাবী ছিলেন শীয়ানে আলী (আঃ) ছিলেন। এই হুজর বিন আদি ও তার সাথীদের কে মুয়াবিয়া নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করে। এই বিষয় জানতে আহলে সুন্নাহর যেকোন প্রামান্য ইতিহাসের কিতাব উঠিয়ে নেওয়া যেতে পারেঃ

১) আল বেদায়া ও আন নেহায়া, খন্ড ৮, জিকরে ৫১ হিঃ

২) তারিখে তাবারী, খন্ড ৩, জিকরে ৫১ হিঃ

৩) তারিখে ইবনে আসাকির, খন্দ ১২ জিকরে হুজুর বিন আদি।

৪) তারিখে ইবনে খলদুন, খন্ড ৩, জিকরে ৫১ হিঃ

৫) আল ইসাবা, ইবনে আব্দুল বার, জিকরে হুজর বিন আদি।

৬) আসাদুল গাবা, খন্ড ১ জিকরে হুজর বিন আদি।

৭) তাবাকাত আল কুবরা, মুহাম্মাদ ইবনে সাদ খন্ড ৬, জিকরে হুজর বিন আদি।

৮) মুসতাদারক আলা সাহিহহাইন, ইমাম হাকিম। খন্ড ৩ জিকরে হুজর বিন আদি।

৯) তারিখ আবুল ফিদা, জিকরে ৫১ হিঃ।

১০) মুরুজ আজ যাহাব খন্ড ২ পাতা ২১৯।

আল ইসাবা,

কাদসিয়া যুদ্ধের পরে হুজর বিন আদী জামাল ও সিফফিনের যুদ্ধে আলী সঙ্গে থেকে যুদ্ধ করেছিল এবং তার শিয়া ছিল। মুয়াবিয়ার হুকুমে তাকে হত্যা করা হয় দামাস্কের কাছে ম্রিয়াজ আদ্রা গ্রামে। তার হত্যার সময় সে আবেদন করে আমার মৃত্যুর পরে হাতে বাঁধা চেন যেন খোলা না হয় আর আমার রক্ত পরিষ্কার না করা হয়, আমরা মুয়াবিয়ার সাথে আবার দেখা করব এবং আল্লাহর কাছে তার বিরুদ্ধে আমার ব্যাপারে নালিশ জানাবো

আল বেদায়া আন নেহায়াঃ

أن معاوية جعل يفرغر بالموت وهو يقول إن يومى بك يا حجر بن عدى لطويل قالها ثلاثا

মুয়াবিয়ার মৃত্যু যখন ঘনিয়ে আসে তখন সে নিজেকে তিনবার বলে হুজর বিন আদি তোর হত্যার জবাবের দিন দীর্ঘ হবে

ইবনে আসির তার বিখ্যাত কিতাব আসাদুল গাবায় উল্লেখ করেছেনঃ

فأنزل هو وأصحابه عذراء وهي قرية عند دمشق فأمر معاوية بقتلهم

হুজর ও তার সাথিদের গ্রেফতার করা হয় এবং দামেস্কের কাছে আদ্রার নামক স্থানে একটা গর্ত করা হয়। মুয়াবিয়া নির্দেশ দেয় যে হুজর ও তার সাথিদের ওই গর্তে হত্যা কর

হুজর বিন আদি রাঃ এর সাথি আব্দুর রহমান বিন হাসানকে হত্যা করা হয়।

এই বিষয় নিচে উল্লেখিত কেতাব সমুহের সাহায্য নেব।

১) আল বেদায়া ও আন নেহায়া, ইবনে কাসির। খন্ড ৮, হুজরের হত্যা।

২) তারিখ আল কামিল, ইবনে আসাকির, খন্ড ৩ পাতা ২৪৫

৩) তারিখ এ তাবারি, খন্ড ১৮ পাতা ১৫১

তারিখ আল কামিল থেকেঃ

যখন আব্দুর রাহমান ইবনে হসানকে গ্রেফতার করা হয় ও মুয়াবিয়ার সামনে পেশ করা হয়, মুয়াবিয়া তাকে জিজ্ঞেস করলো আলী সমন্ধে তোমার মতামত কি? আব্দুর রহমান বলল এটা তোমার পক্ষ্যে উত্তম যে আলির ব্যাপারে আমার মতামত না জিজ্ঞেস করা। মুয়াবিয়া বলল আল্লাহের কসম, আমি তোমাকে ছেড়ে দেব না।আমি সাক্ষী দিচ্ছি যে আলী সেই সব লোকেদের মধ্যে যে সর্বদা আল্লাহের জিকির করে এবং ন্যায়কে দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত করে আর লোকেদের ভুলভ্রান্তিকে ক্ষমা করে। এর পরে মুয়াবিয়া জিজ্ঞেস করে উসমানের ব্যাপারে তোমার কি মত? আব্দুর রহমান উসমান প্রথম ব্যাক্তি যে অবিচারের দরজা খুলে দেয় আর ন্যায়ের দরজা বন্ধ করে দেয়। মুয়াবিয়া বলে তুই নিজেকে হত্যা করলি। আব্দুর রাহমান বলল বরং তুই নিজেকে হত্যা করলি। এর পরে মুয়াবিয়া তাকে যিয়াদের কাছে পাঠিয়ে হুকুম দেয় কষ্টদায়ক মৃত্যু দিতে, ফলে যিয়াদ তাকে জীবন্ত কবর দেয়

মিসাম এ তাম্মার এর হত্যা

মিসাম এ তাম্মার এর হত্যা সহ ইতিহাসে উল্লেখিত ও অনুল্লেখিত হাজারো শিয়াদেরকে হত্যা করে কুফাকে প্রায় শিয়া শূন্য করা হয়।

পরবর্তি একটা ঘটনা উল্লেখ করে সমস্ত ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার হয়ে যাবে যখন ইমাম হুসাইন (আঃ) মক্কা ত্যাগ করেন এবং মুসলিম বিন আকীলকে কুফায় পাঠান এবং তিনি হানি বিন উরওয়ার ঘরে আশ্রয় নেন, এদিকে ইয়াজিদ লাঃ যিয়াদের ছেলে উবাইদুল্লাহকে কুফার গভর্নর করে। হানি ধরা পড়ে উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদের গুপ্তচরদের কাছে। মসজিদে নামাজের পরে হানিকে উপস্থিত করা হয় তখন ইবনে যিয়াদ বলেঃ

তুমি কি জান না হানি, যে আমার আব্বা যখন এই জায়গাতে আসে, তিনি কোন (আলীর) শিয়ার জীবনকে ছেড়ে দেয়নি শুধু তোমার বাবার আর হুজরের (বিন আদি) ছাড়া? (তাবারি ইং খন্ড ১৯ পাতা ৩৮)

ইয়াজিদ লাঃ এর বায়াতঃ

ইয়াজিদের বায়াত ঘুষ ও প্রানের হুমকির মাধ্যমে হয়েছিল। নাম করা ব্যাক্তিবর্গদের ঘুস দেওয়া হয়। ইয়াজিদের বায়াতের জন্য মুয়াবিয়া যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল সেটা শ্যাম,দাম, দন্ড ও ভেদ এর অনুরুপ। ইতিহাসে প্রচুর উল্লেখ হয়েছে মুয়াবিয়ার ঘুস ও ভয় দেখানোর পদ্ধতি। আমি এখানে শুধু মদিনার বিশিষ্ট ব্যাক্তিদের ক্ষেত্রে আলোচনা করে প্রবন্ধের পরিসর সংক্ষিপ্ত রাখছি।

ইবনে কাসির তার আল বেদায়া আন নেহায়ার খন্ড ৮ পাতা ৮৯১ (উর্দু অনুবাদ) এ উল্লেখ করেছেনঃ

যায়েদ বিন বাক্কারের অনুসারে ইব্রাহিম বিন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল আযীজ বিন আয যাহারি তার পিতার থেকে উল্লেখ করেছেন, যে, তার পিতা থেকে উল্লেখ করেছেন যখন আব্দুর রহমান (ইবনে আবু বকর) ইয়াজিদের বায়াত করতে অস্বীকার করে মুয়াবিয়া আব্দুর রহমানের জন্য এক লক্ষ দিরহাম পাঠায়। সে ওগুলিকে ফেরত পাঠায় এই বলে যে এই দুনিয়ার জন্য আমার দ্বীনকে বিক্রি করবো এটা আশা করো না

ইবনে হাজর আস্কালানী তার ফতহুল বারী সারাহ সাহিহ আল বুখারিতে উল্লেখ করেছেন যে ইয়াজিদের জন্য মুয়াবিয়া আব্দুল্লাহ ইবনে উমারের বায়াতের জন্য দাবী জানালো, সে একশ হাজার দিরহাম পাঠালো কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবনে উমার সেই টাকা নিয়ে অস্বীকার করে। (খন্ড ১৩ পাতা ৮০)

যেখানে যেখান ঘুসে কাজ হয়নি সেখানে তেল মালিশ আর সন্ত্রস্ত করার নীতি গ্রহন করে। ইবনে কাসির সহ অন্যান্য ঐতিহাসিকগন পাঁচজন নামি ব্যাক্তির নাম উল্লেখ করেছেন যারা ইয়াজিদের বায়াত করতে অস্বীকার করেছিল।

১) আব্দুর রহমান ইবনে আবু বকর।

২) আব্দুল্লাহ ইবনে উমার।

৩) আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর।

৪) ইমাম হুসাইন ইবনে আলী।

৫) ইবনে আব্বাস।

মুয়াবিয়া নিজে মদিনায় সফর করলেন, এই পাঁচজনকে ডেকে পাঠালেন এবং ধমকি দিলেন যে তার পুত্রের বায়াত করতে অস্বীকারের পরিণতি ভয়ঙ্কর হবে। ( আল বিদায়া ও আন নেহায়া খন্ড ৭ পাতা ৭৯, ৫৭ হিঃ এর ঘটনা)

ইবনে আসাকির এর বিখ্যাত কেতাব তারিখ আল কামিলের খন্ড ৩ পাতা ৪৫৫ এ জিকরে বায়াত ইয়াজিদ অধ্যায়েঃ

পাঁচজন ব্যাক্তি ইয়াজিদের বায়াত করতে অস্বীকার করে। মুয়াবিয়া আয়শার কাছে গিয়ে বলল যদি এই লোকেগুলি ইয়াজিদের বায়াত না করে তবে আমি তাদের হত্যা করবআয়শা উত্তর দিল আমি এটাও শুনেছি যে তুমি খলিফার পুত্রকে ধমকি দিচ্ছ ইয়াজিদের বায়াতের জন্য?

তারিখ আত তাবারী খন্ড ১৮ পাতা ১৮৭, ৫৬ হিঃ এর ঘটানা অধ্যায়ে আব্দুর রাহমান বিন আবু বকর যখন ইয়াজিদের বায়াত করার থেকে দূরে থাকল তখন তাকে এই বলে ধমকি দেওয়া হল ও ইবনে আবি বকর কোন হাতে আর পায়ে তুমি আমাকে অমান্য করতে এসেছ? সে (আব্দুর রহমান) বলল আমি আশা করি এটা আমার জন্য মঙ্গলকর হবে। মুয়াবিয়া বলল ওল্লাহি আমি তোমাকে হত্যার ইচ্ছা পোষণ করি। সে বলল যদি তুমি এমন করো তবে আল্লাহর অভিশাপ হোক তোমার উপরে ইহকালে ও এবং পরকালে তোমাকে আগুনের মধ্যে প্রবেশ করাক

এরপরে আব্দুর রহমানের পিছনে মদিনায় মুয়াবিয়া তার গুন্ডা লেলিয়ে দেয় যাদের হোতা ছিল মারোয়ান ইবনে হাকাম। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌছায় যে মারোয়ান আব্দুর রহমান ইবনে আবুবকরকে হত্যা করার জন্য মুয়াবিয়ার গুন্ডা বাহিনীকে বলে ধর ব্যাটাকে এবং কুরআন শরিফের একটা আয়াত পড়ে যেখানে একজনকে আল্লাহ তালা তিরস্কার করছে, মারোয়ান বলে এই তিরস্কারে আয়াত আবু বকরের এই ছেলের উদ্দেশ্যে নাজিল হয়েছে। আব্দুর রহমান ইবনে আবিবকর ভয়ে তার বোন আয়শার ঘরে ঢুকে লুকায় তখন মারোয়ান ও তাঁর দলবল আয়শার বাড়ির সামনে আসলে উম্মুল মোমেনিন বার হয়ে এসে পর্দার আড়াল থেকে যা বলেন সেটা বুখারি থেকে উল্লেখ করা হল।

বুখারীঃ কিতাবুত তাফাসীর।

مُوْسَى بْنُ إِسْمَاعِيْلَ حَدَّثَنَا أَبُوْ عَوَانَةَ عَنْ أَبِيْ بِشْرٍ عَنْ يُوْسُفَ بْنِ مَاهَكَ قَالَ كَانَ مَرْوَانُ عَلَى الْحِجَازِ اسْتَعْمَلَهُ مُعَاوِيَةُ فَخَطَبَ فَجَعَلَ يَذْكُرُ يَزِيْدَ بْنَ مُعَاوِيَةَ لِكَيْ يُبَايَعَ لَهُ بَعْدَ أَبِيْهِ فَقَالَ لَهُ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ أَبِيْ بَكْرٍ شَيْئًا فَقَالَ خُذُوْهُ فَدَخَلَ بَيْتَ عَائِشَةَ فَلَمْ يَقْدِرُوْا فَقَالَ مَرْوَانُ إِنَّ هَذَا الَّذِيْ أَنْزَلَ اللهُ فِيْهِ {وَالَّذِيْ قَالَ لِوَالِدَيْهِ أُفٍّ لَّكُمَآ أَتَعِدَانِنِيْ} فَقَالَتْ عَائِشَةُ مِنْ وَرَاءِ الْحِجَابِ مَا أَنْزَلَ اللهُ فِيْنَا شَيْئًا مِنَ الْقُرْآنِ إِلَّا أَنَّ اللهَ أَنْزَلَ عُذْرِ

ইউসুফ ইবনু মাহাক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মারওয়ান ছিলেন হিজাযের গভর্নর। তাকে নিয়োগ করেছিলেন মুআবিয়াহ (রাঃ)। তিনি একদা খুতবা দিলেন এবং তাতে ইয়াযীদ ইবনু মুআবিয়ার কথা বারবার বলতে লাগলেন, যেন তাঁর পিতার মৃত্যুর পর তার বায়আত গ্রহণ করা হয়। এ সময় তাকে আবদুর রহমান ইবনু আবূ বাকর কিছু কথা বললেন। মারওয়ান বললেন, তাঁকে পাকড়াও কর। তৎক্ষণাৎ তিনি আয়িশাহ (রাঃ)-এর ঘরে চলে গেলেন। তারা তাঁকে ধরতে পারল না। তারপর মারওয়ান বললেন, এ তো সেই লোক যার সম্বন্ধে আল্লাহ্ অবতীর্ণ করেছেন, ‘‘আর এমন লোক আছে যে, মাতাপিতাকে বলে, তোমাদের জন্য আফসোস! তোমরা কি আমাকে এ ভয় দেখাতে চাও যে, আমি পুনরুত্থিত হব যদিও আমার পূর্বে বহু পুরুষ গত হয়েছে, তখন তার মাতাপিতা আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করে বলে, দুর্ভোগ তোমার জন্য। বিশ্বাস স্থাপন কর, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য। কিন্তু সে বলে এ তো অতীতকালের উপকথা ব্যতীত কিছুই নয়। এই সময় আয়শা পর্দার আড়াল থেকে বললেন যে আমাদের সমন্ধে আল্লাহ তাঁর কুরআনে কোন কিছুই নাজিল করেনি আমার নিস্পাপের আয়াত ছাড়া

পরে মুয়াবিয়া আব্দুর রহমান ইবনে আবু বকরকে গুপ্ত হত্যা করে।

ইবনে উমারের ক্ষেত্রে ফাতহুল বারি সারাহ আল বুখারিতে (খন্ড ১৩ পাতা ৮০) ইবনে হাজর উল্লেখ করেছেনঃ

নাফে বর্ননা করেছেন যে মুয়াবিয়া ইবনে উমারের বাইয়াত ইয়াজিদের জন্য চাইছিল, কিন্তু সে প্রত্যাখান করে এবং বলে আমি দুটি রাজপুত্রকে বায়াত করি না। পরে মুয়াবিয়া ১,০০,০০০ দিরহাম পাঠিয়ে দিলে ইবনে উমর সেটা গ্রহন করে। তারপরে মুয়াবিয়া একজন লোককে পাঠায় এবং সে ইবনে উমরকে বলে কি তোমাকে বায়াত করতে বাধা দিচ্ছে? ইবনে উমর উত্তর দিল যদি এই টাকা ওটার (বায়াতের) জন্য হয় তবে আমার ঈমানের দাম কম। যখন মুয়াবিয়া মারা যায় ইবনে উমর ইয়াজিদের বায়াত করে

মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পরে ইয়াজিদ মসনদে বসে মদিনার গভর্নর ওয়ালিদ বিন উতবাকে চিঠি পাঠালো এদেরকে বায়াত করানোর জন্য। পাঠকগণ দেখুন ইয়াজিদের চিঠিতে কি লিখেছিল।

আল বেদায়া ও আন নেহায়া ইবনে কাসীর খন্ড ৮ পাতা ২৭৮ (বাংলা অনুবাদ) আমার বায়াতের ব্যাপারে হুসাইন, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর ও আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইরের প্রতি প্রচন্ড কঠোর হও এবং বায়াত না করা পর্যন্ত এদেরকে কোন প্রকার ঢীল দিও না

এখানে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে প্রথম থেকেই ইয়াজিদ লাঃ কেমন নির্ণয় নিয়েছিল! এই চিঠি পাওয়ার পরে বনি উমাইয়ার অভিজ্ঞ প্রাক্তন গভর্নর মারোয়ান বিন হাকামকে ওয়ালিদ বিন উতবা ডেকে পাঠায় মতামত দেওয়ার জন্য। মারোয়ান এই চিঠির ভাবসম্প্রাসন করে। মারোয়ান বলেঃ

আল বেদায়া ওয়া আন নেহায়া খন্ড ৮ পাতা ২৭৮ আমার মত হল তারা মুয়াবিয়ার মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার আগেই তুমি তাদের বায়াতের জন্য ডেকে পাঠাও, যদি অস্বীকার করে তাদের গর্দান উড়িয়ে দাও

উক্ত চিঠির কথা ইবনে আসিরের আত তারিখ ফিল কামিলেও উল্লেখ হয়েছে। অন্যান্য বর্ণনায় এও এসেছে যে যদি বায়াত করতে অস্বীকার করে তবে গর্দান উড়িয়ে দেবে।

(প্রসঙ্গত একটা কথা বলি যে ওয়ালিদ যখন তার লোক পাঠায় হুসাইন (আঃ) ও ইবনে যুবাইর মসজিদে ছিলেন। দূত এসে এদেরকে বলে যে গভর্নর ডেকে পাঠিয়েছে, তখন এরা বলে যে তুমি যাও আমরা দেখা করতে যাব, হুসাইন (আঃ) ইবনে যুবাইরকে কানে কানে বলেন যে মনে হচ্ছে এদের স্বেচ্ছাচারী রাজা মারা গিয়েছে, দেখুন হুসাইন (আঃ) এর বুদ্ধিমত্তা। এরপরে ইমাম হুসাইন (আঃ) দেখা করতে যান কিন্তু ইবনে যুবাইর না দেখা করে মক্কায় চলে যায়)।

ইমাম হুসাইন (আঃ) ওয়ালিদের সাথে দেখা করতে যায় কিছু সহচর নিয়ে এবং তাদেরকে বলেন যেআমি ওয়ালিদের অফিসের কামরার ভিতরে ঢুকবো আর তোমরা বাইরে থাকবে পরিস্থিতি খারাব হলে আমি জোরে কথা বললে তোমারা ভেতরে আসবে। ওয়ালিদের কাছে পৌছালে ওয়ালিদ কোন ভনিতা না করে ব্যাপারটা বলে এবং বায়াতের জন্য আবেদন জানায়। ইমাম হুসাইন (আঃ) বলেন যে আমার মত লোক ইয়াজিদের মত লোকের হাতে বায়াত করতে পারে না এই রকম ভাবে লুকিয়ে। ইমাম হুসাইন (আঃ) কিছু সময় চেয়ে নেয়।

এরপরে ইমাম হুসাইন (আঃ) খুবই দুশ্চিন্তা গ্রস্ত ভাবে ফিরে আসেন এবং এক রাত নানা নবী (সাঃ) মা ফাতেমা (সাঃআঃ) ও ভাই হাসান (আঃ) এর কবরের পাশে কাটান এবং বাড়িতে নির্দেশ দেন সফরের আয়োজন করার জন্য। ইমাম হাসান (আঃ) এর এতিম সন্তান ও বিধবাদের নিয়ে এবং বোন যয়নব (সাঃআঃ) সহ পরের রাতে নবি (সাঃ) এর পরিবারকে নিয়ে মক্কায় খুবই দুঃখের সাথে পাড়ি দিলেন।

তৃতীয় অধ্যায় শুরু করার আগে রাসুল (সাঃ) এর কিছু হাদিস উল্লেখ করছি যেখানে রাসুল (সাঃ) ভবিতষৎ বানী করেছিলেন ইমাম হুসাইন (আঃ) এর ফোরাত কূলে নির্মম ভাবে শহিদ করা হবে। এই হাদিস গুলি গুরুত্বপুর্ন কারণ নাসেবীরা ভুলেও এই হাদিসগুলি বলবেনা। আহলে সুন্নাহর মুহাদ্দিসগন প্রচুর হাদিস উল্লেখ করেছেন, কিছু উল্লেখ করলাম।

ক) আলবানি তার সাহিহ জামে আস সাগীরের খন্ড ১ পাতা ৭৩ এ উম্মুল ফজল বিনতে হারিস থেকে উল্লেখ করেছেন রাসুল (সাঃ) বলেছেন জিবরাঈল আমার নিকটে আসলেন আর এই খবর দিলেন যে অতি শিগগির আমার উম্মতরাই আমার এই সন্তান অর্থাৎ হোসায়েন কে হত্যা করবে ,আর আমাকে তার (মৃতস্থানের)কিছু মাটি দিলেন যা লাল রঙয়ের মাটি। (মুহাক্কেক আলবানীঃ সাহিহ)

খ) মুসনদে আবু ইয়ালা আল মাসুলি এর খন্ড ১ পাতা ২৯৮ঃ আব্দুল্লাহ ইবনে নুজাই তার পিতার থেকে বর্ননা করেছে যে আলির সাথে সিফফিনের যুদ্ধে যাচ্ছিল, যখন তারা নওনাহতে ফুরাতের কিনারায় পৌছাল, আলী বলে উঠলো সবর ধরো হে আবা আব্দুল্লাহ (হুসাইন) সবর ধরো হে আবা আব্দুল্লাহ (হুসাইন)। আমি জিজ্ঞেস করলাম হে আবা আব্দুল্লাহ বলতে আপনি কি বোঝাচ্ছেন? তখন আলী বললেন একদা আমি রাসুল সাঃ এর ঘরে গেলাম আর দেখালাম তার চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। আমি বল্লাম হে নবী (সাঃ) কেউ কি আপনাকে রাগান্বিত করেছে? কি (কারণে) আপনার চোখ থেকে অশ্রু বার হচ্ছে? তিনি (সাঃ) বললেন জিব্রাইল (আঃ) আমাকে এই মাত্র ছেড়ে গেলেন আর খবর দিলেন যে হুসাইনকে ফুরাত নদীর কুলে হত্যা করা হবে, তার পরে (জিব্রাইল) বললেন যে আমি কি আপনাকে ওই মাটির (যেখানে হুসাইন আঃ এর হত্যা হবে) ঘ্রাণ নেওয়াবো? আর তিনি (জিব্রাইল আঃ) নিজের হাতটাকে বাড়িয়ে দিলেন ও এক মুঠো মাটি এনে আমাকে দিলেন আর আমি আমার চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না’”

মুহাক্কিক হুসাইন সেলিম আসাদঃ হাসান সনদ।

আলবানি তার সিলসিলাতুস সাহিহয়াতে খন্ড ৩ হাদিস নং ১১৭১ সনদকে যাইফ বলেছেন ইবনে নুজাই এর কারনে কিন্তু বাহাস করে এই হাদিসকে সহিহ প্রমান করেছে।

গ) কিতাবঃ ফাযাইলে সাহাবা, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল, মুহাক্কিক ওসিউল্লাহ মুহাম্মাদ আব্বাস, প্রফেসর উম্মুল কোরা ইনিভারসিটি, মক্কা আল মুকাররামা। খন্ড ২ পাতা ৯৬৫ হাদিস নং ১৩৫৭ আব্দুল্লাহ ইবনে সাইদ তার পিতা থেকে বর্ননা করেছেন ওয়াকি (অন্তর্বর্তি রাবী) বলেছিল আমি ঠিক মনে করতে পারছি না আয়শা না উম্মে সালামা থেকে যে রাসুল সাঃ বলেছেন একজন ফেরেশতা যিনি এর আগে কোন দিন আমার কাছে আসেনি আজ আমার বাড়িতে কাছে এসেছিলেন, তিনি আমাকে বললেন যে আপনার এই পুত্র হুসাইকে হত্যা করবে, যদি আপনি ইচ্ছা করেন তবে আমি মৃত্যু স্থান থেকে আপনাকে কিছু মাটি এনে দিতে পারি তিনি ( রাসুল সাঃ ) বললেন যে তিনি (ফেরেশতা) তার পরে আমাকে কিছু মাটি এনে দিলেন যা লাল রঙয়ের ছিল’”

মুহাক্কিক ওসিউল্লাহ মুহাম্মাদ আব্বাসঃ সাহিহ সনদ। …… তিনি ( আহমাদ ইবনে হাম্বল তার মুসনদে এই হাদিস এনেছেন এবং আহমাদের বর্ননার সব রাবী সহিহ। তাবারানি এই হাদিস আয়শা থেকে বর্ননা করেছেন।………আবু ইয়ালা, বাযযার, তাবারানি বিশ্বস্ত রাবীদের থেকে বর্ননা করেছেন

ঘ) কিতাবঃ মুসনদে আবু ইয়ালা আল মাসুলি, মুহাক্কেক হুসাইন সালিম আসাদ। খন্ড ৬ পাতা ১২৯-১৩০ আনাস ইবনে মালিক হতে…বৃষ্টির ফেরেশ্তা আল্লাহর নিকট অনুমতি চাইলেন নবী সঃ কে জিয়ারাত করার জন্য,সুতারাং তাকে অনুমতি দেওয়া হল, সেদিন উম্মে সালমার দিন থকায় নবী তাঁর ঘরে ছিলেন, নবী (সাঃ) বললেন হে উম্মে সালমা দরজার দিকে নজর রাখো যেন কেউ না আসতে পারে, উম্মে সালমা দরজার নিকটে ছিলেন এমন সময় হঠাৎ হোসায়েন ইবনে আলী এসে  উপস্থিত হল, দরজা খুললেন আর দাখিল হয়ে গেলেন, নবী তখন তাঁকে ধরে বারবার চুম্বন খাচ্ছিলেন, ফেরেশ্তা বললেন আপনি একে (হোসায়েন)খুব ভালোবাসেন?? বললেন হ্যাঁ , (ফেরেশ্তা) বলল আপনার উম্মতরা খুব শিগগির একে (হোসায়েন) হত্যা করবে ,আপনি যদি চান তাহলে আপনাকে সেই স্হান দেখিয়ে দিতে পারি যেখানে একে হত্যা করা হবে , (নবী সঃ) বললেন হ্যাঁ (দেখাও), তখন সেই ফেরেশতা তাঁর (হুসাইন আঃ) এর কতলের স্থান দেখালেন, এবং সেখান থেকে এক মুঠো যেগুলি লাল রঙয়ের মাটি নিয়ে আসলেন, উম্মে সালামা সেটাকে কাপড়ে রাখলেন।

সাবিত বলেনঃ আমরা বলতাম এটা কারবালা

মুহাক্কিকঃ ইসনাদ হাসান।