আহলে বাইতদের নামের পরে আলাইহিস সালাম ব্যবহার।

শীয়া ও সুন্নিদের এক তবকা আহলে বাইত আঃ দের নামের পরে আলাইহিস সালাম বা সংক্ষেপে আঃ ব্যাবহার করে। ইন্টারনেট জগতে সাধারনত সব থেকে বেশি কাউবয়দের তরফ থেকে ছেলেমানুষী আপত্তি করা হয় এই বিষয়ে যে আলাইহিস সালাম কেন ব্যবহার করা হল। সুতরাং কাউবয়দের উদ্দেশ্যে এই এই নিবন্ধে উত্তর দেওয়া হল।

কাউবয়দের আপত্তি

যে নবীদের নামে পরে ছাড়া আলাইহিস সালাম ব্যবহার করা যাবে না।

জবাব ১) কুরান ও হাদিস অনুযায়ী এই কথার দলিল কোথায় যে নবী/ রাসুলদের নামের পরে ছাড়া অন্য কারো নামের পরে আলাইহিস সালাম ব্যাবহার করা যাবে না? কাউবয়দের থেকে কুরান ও হাদিসে দলিল দেওয়ার আবেদন করা হচ্ছে।

জবাব ২) কুরআনে সাধারন মানুষের উপরে সালাম দেওয়া হয়েছে যেমন-কোন ক্ষেত্রে আল্লাহের তরফ থেকে কোন ক্ষেত্রে ফেরেস্তাদের তরফ থেকে। কোথায় মানুষের তরফ থেকে।

  • সুরা ইয়াসিনঃ ৫৮ سَلاَمٌ قَوْلاً مّن رَّبّ رَّحِيمٍ  সালামুন কাউলাম্মির রব্বির রাহিম।
  • সুরা রাদঃ ২৪ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ بِمَا صَبَرْتُمْ সালামুন আলাইকুম বিমা সাবারতুম।
  • সুরা যুমার ৭৩ وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَا سلام عَلَيْكُمْ طِبْتُمْ فادخلوها خالدين ওয়া কলালাহুম খাজানাতুহা সালামুন আলাইকুম তিবতুম ফাদখুলুহা খলেদিন।

উপরের উদাহরন ছাড়া আরো অনেক আয়াত বিধ্যমান যেখানে আল্লাহের সৎ বান্দার উপর সালাম পেশ করা হচ্ছে। অতএব কাউবয়দের আপত্তি ভিত্তিহীন ও মনগড়া।

সালাম ও সালাওয়াত

কুরআনে সালাম ও সালাত রাসুল সাঃ ও তাঁর বংশধরদের উপর পাঠ করা হয়েছে এবং সালাম ও সালাত আলাদা মানে বহন করে এবং এর উদ্দেশ্য আলাদা। কিন্তু রাসুল সাঃ ওফাতের পরে প্রায় ৩০০ বছর পরে অপপ্রয়াস চালানো হয় যে সালাম ও সালাত একই অর্থে ব্যাবহার হয়, সুতরাং সালাত বা সালাম রাসুলগনদের ছাড়া কারো উপরে ব্যাবহার করা যাবে না।

এই অপপ্রয়াস যা ভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন ও দলিল বিহীন কারন কুরআনে আল্লাহ পাক নবী ছাড়া অন্যদের উপরেও শুধু সালাত পাঠিয়েছেন যেমনঃ

أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ

সুরা বাকারায় ১৫৭ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন উলাইকা আলাইহিম সালাওয়াতু মিরর রব্বিহিম ওয়া রাহমাহ……।

“আর ওই সমস্ত লোকেদের উপর তাঁদের রবের পক্ষ থেকে সালাওয়াত ও রহমত’। 

সুতরাং উপরের ওই কথা যে সালাম ও সালাওয়াত একই অর্থ ব্যাবহার করে এবং তা নবী রাসুলদের উপর ছাড়া কারো উপর ব্যবহার করা যাবে না সেটা পরিপুর্ন ভাবে কুরান বিরোধী।

আর একটা হাদিস দিলে ব্যাপারটা আর পরিষ্কার হয়ে যাবে যে সালাম ও সালাওয়াত আলাদা।

যখন এই আয়াত নাজিল হয়ঃ (সুরা আহযাব আয়াত নং ৫৬)

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

“আল্লাহ ও মালাইকাগন নবীর উপরে সালাওয়াত পড়ে, হে মোমিনগণ, তোমরা তাঁর উপর সালাওয়াত পড়ো এবং সালাম পেশ করো পরিপুর্ন (যোগ্য) সালাম”।

এই আয়াত নাজিল হলে সাহাবারা নবী সাঃ এর কাছে আসেন এবং জিজ্ঞাস করেন যে আমরাতো কিভাবে সালাম দিতে হয় জানি কিন্তু সালাওয়াত কিভাবে দিতে হয় সেটা জানি না, সেই বিষয় আমাদের শেখান। এখান থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে সাহাবারা সালাম ও সালাওয়াত আলাদা আলাদা অর্থে নিয়েছেন, নইলে জিজ্ঞাস করেতেন না যে আমাদেরকে সালাওয়াত দেওয়া শেখান।

(হাদিস বুখারিঃ হাদিস ১)

باب الصَّلاَةِ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم

حَدَّثَنَا آدَمُ، حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، حَدَّثَنَا الْحَكَمُ، قَالَ سَمِعْتُ عَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ أَبِي لَيْلَى، قَالَ لَقِيَنِي كَعْبُ بْنُ عُجْرَةَ فَقَالَ أَلاَ أُهْدِي لَكَ هَدِيَّةً، إِنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم خَرَجَ عَلَيْنَا فَقُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَدْ عَلِمْنَا كَيْفَ نُسَلِّمُ عَلَيْكَ، فَكَيْفَ نُصَلِّي عَلَيْكَ قَالَ ‏ “‏ فَقُولُوا اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ ‏”

“আবদুর রাহমান ইবনু আবূ লায়লা (রহঃ) বর্ণনা করেন, একবার আমার সঙ্গে কাব ইবনু উজরাহ (রাঃ) এর সাক্ষাত হলো। তিনি বললেনঃ আমি কি তোমাকে একটি হাদিয়া দেবো না। তা হল এইঃ একদিন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট বেরিয়ে আসলেন, তখন আমরা বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা জানি আপনাকে কেমন করে সালাম দেব, আমরা আপনার উপর দরুদ কিভাবে পড়বো?

তিনি বললেনঃ তোমরা বলবে, ইয়া আল্লাহ আপনি মুহাম্মাদের উপর ও তার বংশধদের উপর সালাত বর্ষণ করুন, যেমন আপনি ইবরাহীম এর বংশধরের উপর সলাত বর্ষণ করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত, উচ্চ মর্যাদাশীল। ইয়া আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদের উপর ও তাঁর বংশধরের উপর বরকত দিন, যেমন আপনি ইববাহীম এর  উপর বরকত দিয়েছেন, নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত উচ্চ মর্যাদাশীল”

(হাদিস বুখারিঃ হাদিস ২)

باب قوله إن الله وملائكته يصلون على النبي يا أيها الذين آمنوا صلوا عليه وسلموا تسليما قال أبو العالية صلاة الله ثناؤه عليه عند الملائكة وصلاة الملائكة الدعاء قال ابن عباس يصلون يبركون لنغرينك لنسلطنك

حَدَّثَنِي سَعِيدُ بْنُ يَحْيَى، حَدَّثَنَا أَبِي، حَدَّثَنَا مِسْعَرٌ، عَنِ الْحَكَمِ، عَنِ ابْنِ أَبِي لَيْلَى، عَنْ كَعْبِ بْنِ عُجْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَمَّا السَّلاَمُ عَلَيْكَ فَقَدْ عَرَفْنَاهُ فَكَيْفَ الصَّلاَةُ قَالَ ‏ “‏ قُولُوا اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ ‏”

বুখারি , কিতাবুত তাফাসীর (সুরা আহযাবে ৫৬ নং আয়াতের তাফসীরে)

“কাব ইবনু উজরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। বলা হল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার উপর সালাম করা আমরা জানতে পেরেছি; কিন্তু সালাত কি ভাবে? তিনি বললেন, তোমরা বলবে, “হে আল্লাহ্! তুমি মুহাম্মদ এবং মুহাম্মদের পরিজনের উপর সালাত কর, যেমনিভাবে ইব্রাহীম এর পরিজনের উপর তুমি সালাত অবতীর্ণ করেছ। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসিত, মর্যাদাবান। হে আল্লাহ্! তুমি মুহাম্মদ এর উপর এবং মুহাম্মদ এর পরিজনের প্রতি বরকত অবতীর্ণ কর। যেমনিভাবে তুমি বরকত অবতীর্ণ  করেছো ইব্রাহীমের পরিজনের প্রতি। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসিত, মর্যাদাবান”

সুতরাং উপরের আয়াত থেকে এবং রাসুল সাঃ কৃত তাফসীর থেকে প্রমানিত হল যে মুহাম্মাদ ও আলে মুহাম্মাদ তথা আহলে বাইতদের উপর সালাত পাঠানো যাবে এবং এটাই আমরা প্রত্যেক সালাতে (নামাজে) পড়ি।

আলাইহিস সালাম ব্যাবহার করা হয়েছে

যাইহোক এখানে আমরা বাংলাদেশের আহলে হাদিসদের থেকে প্রকাশিত তাওহিদ পাবলিকেশন্স এর ছাপা বুখারি থেকে স্কান দেব। যেখানে বুখারির মুল আরবীটাকে রাখা হয়েছে। অন্যথায় যেকোন আরবী বুখারি দেশি বা বিদেশ থেকে প্রকাশিত হোক না কেন। কেননা বুখারি কতৃক আহলে বাইত আঃ দের নামের পরে আলাহিস সালাম ব্যাবহার করা হয়েছে সেটা যেকোন মুহাদ্দেশ জানে এটা কোন নতুন কথা নয়। আমরা বেশ কয়েটা বুখারি থেকে মিলিয়ে দেখেছি। মিশর, সৌদি থেকে শুরু করে ভারতের অনেক পুরানো দ্বীনি কেতাব ছাপাখান ফরিদ বুক ডিপো থেকে প্রকাশিত বুখারি দেখেছি। অন্যান্য কেতাবে সাহাব/উম্মুল মোমেনিনদের কারো কারো নামের পরেও আলাইহিস সালাম ব্যাবহার করা হয়েছে।

নিচে একে একে ৯ খানা স্কান দেওয়া হল। সাথে বাংলার ও লিংক দিলাম যেখানে আরবী ট্যাবে গিয়ে দেখতে পাবেন।

আহলে হাদিসদের দ্বারা প্রকাশিত তাওহিদ পাবলিকেশন্স এর ছাপা আরবী-বাংলা বুখারি।

১) খন্ড ১ বাব (অধ্যায়) ১৯/৫ এর নিচে ইমাম বুখারি ফাতিমা ও আলি এর নামের পরে আলাইহিমাস সালাম লিখেছেন।

(স্ক্যান কপির জন্য নিচের ছবিতে ক্লিক করুন)

অনলাইন লিংক- https://www.hadithbd.com/hadith-link.php?hid=24965

২) খন্ড ৪ হাদিস নং ৪০০৩ এ আলি ইবনে হুসাইন ( অর্থাৎ ইমাম যায়নাল আবেদিন) ও হুসাইন এর নামের পরে আলাইহিমুস সালাম ব্যাবহার হয়েছে।

(স্ক্যান কপির জন্য নিচের ছবিতে ক্লিক করুন)

অনলাইন লিংক- https://www.hadithbd.com/show.php?BookID=12&HadithNo=4003#dmxTabs1-3

৩) খন্ড ৪ হাদিস নং ৪২৫১ যেখানে ফাতিমার নামের পরে আলাইহাস সালাম লেখা হয়েছে।

(স্ক্যান কপির জন্য নিচের ছবিতে ক্লিক করুন)

অনলাইন লিংক- https://www.hadithbd.com/show.php?BookID=12&HadithNo=4251#dmxTabs1-3

৪) খন্ড ৪ হাদিস নং ৪২৪০ যেখানে ফাতিমার নামের পরে আলাইহাস সালাম লেখা হয়েছে।

(স্ক্যান কপির জন্য নিচের ছবিতে ক্লিক করুন)

অনলাইন লিংক- https://www.hadithbd.com/show.php?BookID=12&HadithNo=4240#dmxTabs1-3

৫) খন্ড ৪ অধ্যায় ৬৪/৬২ ইমাম বুখারি বাবের নাম দিয়েছে ‘বা’আসা আলি ইবনে আবি তালিব আলাইহিস সালাম………’।

(স্ক্যান কপির জন্য নিচের ছবিতে ক্লিক করুন)

অনলাইন লিংক- https://www.hadithbd.com/show.php?BookID=12&HadithNo=4349#dmxTabs1-3

৬) খন্ড ৩ ইমাম বুখারি বাবে ফাতিমার নামের পরে আলাহাস সালাম লিখেছেন।

(স্ক্যান কপির জন্য নিচের ছবিতে ক্লিক করুন)

অনলাইন লিংক- https://www.hadithbd.com/show.php?BookID=12&HadithNo=3767#dmxTabs1-3

৭) খন্ড ৩ হাদিস নং ৩৭৪৮ হুসাইনের নামের পরে আলাইহাস সালাম লিখেছেন।

(স্ক্যান কপির জন্য নিচের ছবিতে ক্লিক করুন)

অনলাইন লিংক- https://www.hadithbd.com/show.php?BookID=12&HadithNo=3748#dmxTabs1-3

৮) খন্ড ৩ বাব ৬২/১২ ইমাম বুখারি লিখেছেন ফাতিমা আলাইহাস সালাম বিন্তে নবী সাঃ এবং হাদিস নং ৩৭১১ এ ফাতিমা আলাইহাস সালাম লেখা হয়েছে।

(স্ক্যান কপির জন্য নিচের ছবিতে ক্লিক করুন)

অনলাইন লিংক- https://www.hadithbd.com/show.php?BookID=12&HadithNo=3711#dmxTabs1-3

৯) খন্ড ৩ হাদিস নং ৩৭০৫ হাদিসে ফাতিমার নামের পরে আলাইহাস সালাম লেখা হয়েছে।

(স্ক্যান কপির জন্য নিচের ছবিতে ক্লিক করুন)

অনলাইন লিংক- https://www.hadithbd.com/show.php?BookID=12&HadithNo=3705#dmxTabs1-3